নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: প্রথম শ্রেণীর ছাত্রী সঞ্জনা মণ্ডলকে খুন করার পর তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করতে হস্টেলে চুরি এবং ভৌতিক কর্মকাণ্ডের গল্প ফেঁদেছিল ধৃত নবম শ্রেণির দুই ছাত্রী। পুলিশের দাবি, নিজেদের উপর থেকে সন্দেহ সরাতে তারা পরিকল্পিতভাবে এমন পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করেছিল, যাতে মনে হয় হস্টেলে দীর্ঘদিন ধরেই রহস্যজনক নানা ঘটনা ঘটছে। কিন্তু, জিজ্ঞাসাবাদের সময় বারবার একই ধরনের গল্প শোনাতে গিয়েই পুলিশের সন্দেহের কেন্দ্রে চলে আসে দু’জনে। অভিযুক্তদের এই কৌশল ও মানসিকতা দেখে রীতিমতো হতবাক তদন্তকারীরা।
মঙ্গলবার গুজরাত থেকে কৃষ্ণনগরে ফিরে কোতোয়ালি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন নিহত সঞ্জনা মণ্ডলের মা। তার আগেই অবশ্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটে। শনিবার সকালে কৃষ্ণনগর কুইন্স উচ্চ বিদ্যালয়ের হস্টেলের একটি বাথরুম থেকে প্রথম শ্রেণির ছাত্রী সঞ্জনার নিথর দেহ উদ্ধার হয়। তদন্তে জানা যায়, প্রথমে তাকে জলের মধ্যে ডুবিয়ে রাখা হয়। পরে দু’হাতের শিরা কেটে খুন করা হয়। ঘটনায় হস্টেলেরই নবম শ্রেণির দুই ছাত্রীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ। টানা জেরায় তারা ভেঙে পড়ে অপরাধের কথা স্বীকার করে নেয় বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। তদন্তকারীরা জানান, শনিবার সকাল থেকেই হস্টেলের আবাসিক এবং কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়। সেই সময় একাধিক আবাসিক পুলিশকে জানায়, গত ক’দিন ধরে নবম শ্রেণির দুই ছাত্রী বারবার হস্টেল বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা বলছিল। হস্টেলের এক আবাসিক জানায়, ঘটনার আগের রাতে সে দেখেছিল, ওই দুই নবম শ্রেণির ছাত্রী সঞ্জনাকে নিয়ে বাথরুমের দিকে যাচ্ছে। এরপরই অভিযুক্তদের আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন তদন্তকারীরা। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, জেরার সময় দুই ছাত্রী বারবার হস্টেলের ভিতরে ‘ভৌতিক কর্মকাণ্ড’-এর কথা বলতে থাকে। তারা দাবি করে, রাতের অন্ধকারে অজ্ঞাতপরিচয় কেউ আবাসনের ভিতরে ঘোরাফেরা করে এবং বিভিন্ন অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটায়। শুধু ভৌতিক গল্পই নয়, হস্টেলের ভিতরে ধারাবাহিক চুরির ঘটনাও ঘটছে বলে দাবি করে অভিযুক্তরা। তাদের বক্তব্য, আবাসিকদের ব্যবহারের বিভিন্ন জিনিসপত্র নির্দিষ্ট স্থান থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তদন্তকারীরা যখন অন্য আবাসিকদের সঙ্গে কথা বলেন, তখন কেউই এমন চুরির অভিযোগের কথা স্বীকার করেনি। বরং দেখা যায়, চুরির প্রসঙ্গ একমাত্র ওই দুই ছাত্রীর মুখেই উঠে আসছে। এই অসঙ্গতিই পুলিশের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দেয়। এরপর তাদের ব্যক্তিগত ব্যাগ তল্লাশি করে একাধিক চাবি উদ্ধার হয়। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, দীর্ঘদিন ধরেই হস্টেলটি বন্ধ করে দিতে কোনও না কোনও বড় পরিকল্পনা করছিল ওই দুই ছাত্রী। তদন্তকারীদের ধারণা, ভবিষ্যতে কোনো গুরুতর ঘটনা ঘটলে যাতে সন্দেহ অন্যদিকে ঘোরানো যায়, সেই উদ্দেশ্যেই আগে থেকে চুরি এবং ভৌতিক ঘটনার গল্প ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তদন্তে উঠে এসেছে, হস্টেল বন্ধ করানোর লক্ষ্য নিয়েই তারা শেষপর্যন্ত এই চরম পদক্ষেপ করেছিল। জিজ্ঞাসাবাদে সেই কথাও তারা স্বীকার করেছে বলে পুলিশ সূত্রে দাবি। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর শনিবার গভীর রাতে ভেঙে পড়ে দুই অভিযুক্ত। পুলিশ সূত্রে খবর, তখনই তারা খুনের বিষয়টি স্বীকার করে। তদন্তকারীদের একাংশের বক্তব্য, অপরাধের পর নিজেদের আড়াল করতে শিশুমনে যে ধরনের গল্প ও কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত অস্বাভাবিক।