জমিদারের অপমানবোধ থেকেই শুরু হয়েছিল মা কালীর আরাধনা, ১২৭ বছরে নারায়ণগড়ের দুড়িয়া বাটিটাকির ঐতিহ্য
  • ৬ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সৌম্যকান্তি ত্রিপাঠী, বেলদা: জমিদারের অপমানবোধ থেকে জন্ম নিয়েছিল এক নতুন ধর্মীয় ঐতিহ্য। সময়ের স্রোত পেরিয়ে সেই পুজোই আজ পরিণত হয়েছে গোটা গ্রামের মিলনোৎসবে। পশ্চিম মেদিনীপুরের নারায়ণগড় ব্লকের দুড়িয়া বাটিটাকির ঐতিহ্যবাহী কালীপুজো এবার ১২৭ বছরে পা দিল। ১৮৯৯ সালে স্থানীয় জমিদার তরেন্দ্রনাথ দাসের হাত ধরে শুরু হওয়া এই পুজোর ১২৭ বছর পূর্তি উপলক্ষে এবার বিশেষ আয়োজন করেছেন উদ্যোক্তারা।

Advertisement

পুজোর সূচনা ঘিরে রয়েছে এক ব্যতিক্রমী ইতিহাস। স্থানীয়দের মুখে প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, পাশের খুড়শি গ্রামে আগে থেকেই প্রাচীন কালীপুজো হতো। একবার সেই পুজোয় জমিদার তরেন্দ্রনাথ দাসকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি নিজে উপস্থিত না থেকে তাঁর দুই অনুগামী শশী ও বশী ভুঁইয়াকে পাঠান। সেকালে অতিথি আপ্যায়নের অন্যতম রীতি ছিল হুঁকোয় তামাক খাওয়ানোর ব্যবস্থা। কিন্তু অভিযোগ, জমিদারের পাঠানো ওই দুই ব্যক্তিকে যথাযথ সম্মান ও আতিথেয়তা জানানো হয়নি। এমনকী, প্রথা অনুযায়ী তামাকও দেওয়া হয়নি তাঁদের। গ্রামে ফিরে তাঁরা জমিদারকে ঘটনার কথা জানান। এতে অপমানিত বোধ করেন তরেন্দ্রনাথ। এরপরই নিজের গ্রামে কালীপুজো শুরুর সিদ্ধান্ত নেন। মন্দির নির্মাণের জন্য দান করেন ১৪ ডেসিমিল জমি।
পুজোর সূচনালগ্ন থেকেই গ্রামবাসীদের যুক্ত করেছিলেন জমিদার। রাখাল নন্দী, তিতারাম ভুঁইয়া, গুণধর দে ও নীহারকান্ত মাইতির মতো স্থানীয় বাসিন্দারা পুজোর আয়োজনে সক্রিয় ভূমিকা নেন। প্রথমদিকে ত্রিপল টাঙিয়ে পুজো হতো। পরে মাটির দেওয়াল ও টালির চাল দিয়ে তৈরি হয় মন্দির। জমিদার পরবর্তীকালে তাঁর মেজো ছেলে চিত্তরঞ্জন দাসের হাতে পুজো ও জমিদারির দায়িত্ব তুলে দেন। একসময় বন্যায় মাটির মন্দির ভেঙে গেলে গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় নির্মিত হয় আজকের পাকা মন্দির।
বর্তমানে জমিদারি প্রথার অবসান ঘটলেও পুজোর ঐতিহ্য অটুট। দুড়িয়া বাটিটাকি গ্রামীণ পুজো কমিটির উদ্যোগে প্রতি বছর পুজো হয়। কমিটির সভাপতি শতদল মাইতি এবং সম্পাদক তথা জমিদার পরিবারের সদস্য বিজিত দাস জানান, ১২৭ বছর পূর্তি উপলক্ষে এবার ১২৭টি প্রদীপ জ্বালিয়ে পুজোর সূচনা হবে। মন্দির সংস্কারের কাজ চলায় বড়ো কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকছে না। তবে কালীপুজোর পরের দিন সব গ্রামবাসীকে একসঙ্গে বসিয়ে খাওয়ানোর  ব্যবস্থা থাকে। এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ প্রসাদ বিতরণের বিশেষ রীতি। ফলমূলের পাশাপাশি লুচি, সুজি ও নারকেলের নাড়ু গ্রামের প্রতি বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। মন্দির ও দেবীর মুখ পূর্বমুখী। প্রতি বছর একই শিল্পী প্রতিমা নির্মাণ করেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, পুজোর পর প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয় না। সারা বছর মন্দিরেই থাকেন দেবী। পরের বছর নতুন পুজোর ঠিক আগে আগের বছরের প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। তবে মন্দিরে নিত্যপুজোর কোনো প্রচলন নেই।