রাজনাথ সিং (প্রতিরক্ষামন্ত্রী): ‘একজনের কাছে স্বাধীনতা সংগ্রামী, অন্যের কাছে সন্ত্রাসবাদী’— এ ধারণা এক বিপজ্জনক মিথ্যাচার। কারণ, মানবতার উপর আঘাতের অপর নাম সন্ত্রাসবাদ। জঙ্গিদের মূল অস্ত্র আতঙ্ক ছড়ানো। তারপরও অবশ্য তারা ব্যর্থ হচ্ছে, ভারত এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ। সেটা ২৬/১১ বা ২০০১ সালে সংসদ হামলা হোক কিংবা পহেলগাঁওয়ে সাম্প্রতিক জঙ্গি হানা, ভারত আজ অতীতের তুলনায় আরও শক্তিশালী। ঐক্যবদ্ধ ভারতের সামনে দাঁড়িয়ে সন্ত্রাসবাদ, তার ভ্রান্ত মতাদর্শ ব্যর্থ হতে বাধ্য। সমস্ত শান্তিকামী রাষ্ট্র এবং ব্যক্তিকে একযোগে এই অভিশাপকে চিরতরে নির্মূল করতে হবে। সেটা কীভাবে সম্ভব, তা দেখিয়ে দিয়েছে ভারত।
সন্ত্রাসবাদ আজ কেবল ভারতের নয়, সমগ্র বিশ্বের সমস্যা। বিশ্ব সন্ত্রাসবাদ সূচক (জিটিআই) অনুযায়ী, জঙ্গি হামলার সাক্ষী দেশগুলির সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরাও দশকের পর দশক ধরে পাকিস্তানের মদতে সীমান্তপারের সন্ত্রাসের শিকার। পহেলগাঁওয়ে সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলা ছিল ভারতের ঐক্যকে বিনষ্ট করার বর্বরোচিত চেষ্টা। এদেশের মানুষের মনে ভীতি সঞ্চারের সেই প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছে। সন্ত্রাসবাদকে কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না—এব্যাপারে অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে ভারত। জানিয়ে দিয়েছে, আলোচনা এবং জঙ্গিহানা হাত ধরাধরি করে চলতে পারে না। পাকিস্তানের সঙ্গে ভবিষ্যতে আলোচনা হবে কেবল মাত্র সন্ত্রাসবাদ এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীর নিয়ে। পাকিস্তানের তাই উচিত, রাষ্ট্রসঙ্ঘ স্বীকৃত কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদী হাফিজ সইদ এবং মাসুদ আজহারকে এখন ভারতের হাতে তুলে দেওয়া।
২০১৬-য় সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, ২০১৯-এ বালাকোট স্ট্রাইক এবং বর্তমানে ২০২৫-এ অপারেশন সিন্দুর—দীর্ঘ সময় ধরে আমরা জঙ্গি হামলার জবাব দিয়েছি। কিন্তু এবার সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ও তাদের পাকিস্তানি মদতদাতাদের বিরুদ্ধে নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে ভারত। শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতা কিংবা রক্ষণাত্মক পদক্ষেপ নয়, আমাদের নীতি এখন, জঙ্গিরা যেখানেই থাকুক তাদের উৎখাত করব। যে কোনও সন্ত্রাসের ঘটনাকে যুদ্ধ হিসেবেই দেখব। পাকিস্তান যদি তাদের মাটিতে জঙ্গি কার্যকলাপে রাশ টানতে না পারে, তাহলে সেই ব্যর্থতার দায় তাদেরকেই মেটাতে হবে।
নয়াদিল্লিতে আয়োজিত সন্ত্রাসবাদে আর্থিক মদতবিরোধী মন্ত্রী পর্যায়ের তৃতীয় সম্মেলনে এই অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, ‘সন্ত্রাসবাদকে উপড়ে না ফেলা পর্যন্ত আমাদের বিশ্রাম নেই।’ অপারেশন সিন্দুর সেই কাজই করে দেখিয়েছে। শুধু জঙ্গিঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়া নয়, পাকিস্তানকে কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে পেরেছে ভারত। সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তিও স্থগিত রাখা হয়েছে।
আগামী প্রজন্মের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে আমাদের বিশ্বব্যাপী পাঁচটি কৌশল গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, সন্ত্রাসবাদের আন্তর্জাতিক ও সর্বাত্মক ব্যাখ্যা স্থির করা। বিদেশ থেকে জঙ্গিদের প্রত্যর্পণ সুনিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, জঙ্গিদের আয়ের রাস্তা বন্ধ হওয়া দরকার। একই সঙ্গে প্রয়োজন সন্ত্রাসবাদের মদতদাতা দেশগুলিকে উচিত শিক্ষা দেওয়াও। এফএটিএফ-এর উচিত পাকিস্তানকে পুনরায় ধূসর তালিকাভুক্ত করা। ওরা যতদিন জঙ্গি কার্যকলাপের পথ থেকে সম্পূর্ণ সরে না আসছে, ততদিন পর্যন্ত কোনও অর্থ সাহায্য করা উচিত নয়। তৃতীয়ত, পারমাণবিক অস্ত্রগুলি যাতে জঙ্গিদের হাতে না পৌঁছয়, সেটা সুনিশ্চিত করা! পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রগুলিকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পূর্ণ নজরদারিতে আনা দরকার। চতুর্থত, জঙ্গিদের সাহায্যে যারা প্রতিবেশী দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে, সেই সমস্ত দেশগুলিকে আলাদা করে চিহ্নিত করা দরকার। আর পঞ্চমত, সন্ত্রাসবাদের বিপদ মোকাবিলায় গোটা বিশ্বের সহযোগিতা প্রয়োজন। এখনই উপযুক্ত সময়, সমস্ত দেশ এগিয়ে এসে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সর্বাত্মক কনভেনশনে স্বাক্ষর করুক। সমস্ত শান্তিকামী রাষ্ট্রকে আমাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।