ডঃ রাকেশ মজুমদার: হাতে তাঁর উজ্জ্বল তিরঙ্গা। মাঝে অশোক চক্র। পৃথিবীর আকাশ ভেদ করে মহাকাশের বাড়িতে পৌঁছে গেল আমাদের দেশের জাতীয় পতাকা। নিয়ে গেলেন ভারতীয় বায়ুসেনার গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু শুক্লা। প্রশ্ন আসে, এ কি শুধুই গর্ব করার মতো বিষয়? শুধুই কি ৪১ বছর বাদে ‘জয় হিন্দ’ বলে হাততালি দেওয়ার সময় এটা? নাকি এই অভিযানের মধ্যে ভারতের আরও কিছু পাওয়ার রয়েছে? মনে রাখতে হবে, ইসরোর আগামী মিশন গগনযান। সেই গগনযানে চড়ে যাঁরা মহাকাশে যাবেন, তাঁদের মধ্যে একজন এই শুভাংশু। অর্থাত্ গগনযান অভিযানের আগেই ভারত এমন একজনকে পেয়ে গেল, যিনি হাতেকলমে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নভশ্চর। এখান থেকেই ইসরোর কাছে একটা নতুন দরজা খুলে গেল।
কী সেই দরজা? আজ পর্যন্ত ইসরো বা ভারতের মাটি থেকে কোনও মানুষ মহাকাশে যাননি। রাকেশ শর্মা কিন্তু ৪১ বছর আগে সোভিয়েত দেশ থেকে মহাকাশে গিয়েছিলেন। এবার আমরা গগনযান মিশনের মাধ্যমে মানুষ পাঠাব মহাকাশে। এরপর থেকে ইসরো যে শুধুই নিজেদের দেশের মানুষ পাঠাবে, তা কিন্তু নয়। নাসা যেমন এই মিশনে পোল্যান্ড, হাঙ্গেরির লোককেও মহাকাশে পাঠাচ্ছে, আমাদের ইসরোও তেমনই বাইরের দেশের লোকও পাঠাবে। এর মাধ্যমেই বিক্রম সারাভাইয়ের দেখা স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হতে চলেছে।
একটা সময় ভারতের মহাকাশ মিশন নিয়ে বহু সমালোচনা হয়েছিল। উন্নয়নশীল ভারতের কাছে মহাকাশ মিশন ব্যয়বহুল বলে প্রশ্ন উঠেছিল। এখন ইসরো মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠাচ্ছে। ভারত সরকারের একটি লাভজনক সংস্থায় পরিণত হয়েছে তারা। এবার বিদেশি নভশ্চরদেরও মহাকাশে পাঠিয়েও অর্থনৈতিকভাবে আরও লাভবান হতে পারবে ইসরো।
এই মিশনের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে—তা হল গবেষণা। ভারতের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের থেকে মোট সাতটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। এই মিশনে সেগুলির উপরে গবেষণা চলবে। আগামী দিনে মঙ্গল গ্রহ বা চাঁদে যে সমস্ত গবেষণা করার পরিকল্পনা রয়েছে, সেগুলির ক্ষেত্রে এই মিশনের গবেষণালব্ধ ফল অনেকাংশে কাজে দেবে। মাইক্রো গ্র্যাভিটিতে খাবার, মানুষের শরীর কেমন থাকে—সেই সমস্ত বিষয়ে গবেষণার নতুন দিক খুলে যাবে। একথা বলার কারণ, আমরা পৃথিবীতে বসে পরীক্ষাগারে মাইক্রো গ্র্যাভিটি তৈরি করতে পারি না। সেটা স্পেস স্টেশনে গিয়েই করা সম্ভব। যার ফলে ভারতীয় গবেষকরা একেবারে হাতেকলমে মাইক্রো গ্র্যাভিটিতে পরীক্ষালব্ধ তথ্য পাবে।
সব মিলিয়ে একটা বিষয় স্পষ্ট, নাসার এই মিশনটি ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। যা আমাদের দেশের মহাকাশ গবেষণাকে আরও বেশি সমৃদ্ধ করে তুলবে। (লেখক বিড়লা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড টেকনোলজিক্যাল মিউজিয়ামের কিউরেটর)