নিজস্ব প্রতিনিধি, দুর্গাপুর: সারা রাজ্যের মতো স্টিল সিটি দুর্গাপুরের রাস্তার মোড়ে, মোড়ে আর বাজে না রবীন্দ্রসংগীত। ট্রাফিক সিগনালের সামনে রোদে, জলে দাঁড়িয়ে একঘেয়ে সময় কাটে পথচারীদের। যদিও এই ক্লান্ত পথচারীদের এক টুকরো বিনোদন এনে দিচ্ছে ছোট্টো অর্চনা। রাস্তায় লাল বাতি জ্বললেই, কোমর দুলিয়ে নাচ ও জিমন্যাস্টিকের কসরত দেখাতে শুরু করে সে। দুই গালে রং মাখা ছোট্ট অর্জনের নাচ দেখে অনেকেই হেসে খুন। হাসিমুখে বাড়ি ফিরছেন বিবেক পাল, রথীন মণ্ডলরা।
বছর ছয়েকের অর্চনার পুরো নাম অর্চনা নাট। সে সুদূর ছত্রিশগড় থেকে দুর্গাপুরে এসেছে রুজি-রুটির টানে। মা মিনা কুমারী নাট রাস্তার পাশে ঢোল বাজাচ্ছেন। ঢোলের তালে তালেই নাচে একরত্তি অর্চনা। সেই নাচেই ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়ানো অফিস, কারখানা ফেরত মানুষগুলির জন্য থাকে কয়েক সেকেন্ডের টুকরো বিনোদন। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কের উপর রয়েছে ট্রাফিক সিগন্যাল। এই যান নিয়ন্ত্রণের সিগন্যালই রুজি-রুটির জোগান দিচ্ছে এই অর্চনাদের। মোড়ের কোণে দাঁড়িয়ে থাকে মা ও মেয়ে। সেখানে সিগন্যাল লাল হলেই গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ছে। তখনই নাচ শুরু করে অর্চনা। যা দেখে অনেকেই খুশি হন। কেউ বালিকার হাতে তুলে দেন কিছু টাকা। আবার কেউ শুধুই মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। যদিও তার ছবি ক্যামেরাবন্দি করতে চাইলেই মুখ ঢেকে নেয় অর্চনা। এই একরত্তির কাঁধে অনেক দায়িত্ব। তার নাচ মানুষকে বিনোদন দিলেও এর বিনিময়ে পাওয়া টাকায় মা ও মেয়ের সংসার চলে। শুধু অর্চনা নয়, দুর্গাপুরে সিটি সেন্টারে দেখা মেলে সানিয়া বেদেরও। বছর আটেকের এই কিশোরী ভিক্ষা করে না, কলম বিক্রি করে। বিনামূল্যে শিক্ষা যে দেশের প্রতিটি শিশুর অধিকার সেই শিক্ষার হাতিয়ারকে বিক্রি করেই সংসার চালাতে হচ্ছে সানিয়াদের। দুর্গাপুরে রাস্তায় পথ শিশুদের করুণ দশা দেখলে বোঝা যায় শিক্ষার অধিকার আইন শুধু থেকে যাচ্ছে খাতায়-কলমে।
অর্চনা, সানিয়াদের কথায়, স্কুলে গিয়ে পড়তে তো ইচ্ছে করে, কিন্তু আমাদের সময় কোথায়! রিনা মিশ্র, রিতিকা চট্টোপাধ্যায়রা বলেন, এদের স্কুলের অঙ্গনে আনতে না পারলে কোনোদিনই ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ প্রকল্প সফল বলা যাবে না। রাস্তার ধারে গাড়ি থামলেই নেচে ওঠে খুদে অর্চনা।-নিজস্ব চিত্র