শুভঙ্কর বসু, কলকাতা: অর্থের নিরিখে মায়ের শ্রমের মূল্য হয় না! ঘড়ির কাঁটা ধরেও মাতৃশ্রমের অঙ্ক নির্ধারণ অসম্ভব! আইনের বিচারও এই সত্যকেই মান্যতা দেয়। কোনো কিছুর নিরিখেই মাতৃশ্রমের মূল্য নির্ধারণ সম্ভব নয়। দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত একটি মামলার রায়ে স্পষ্ট করে একথাই জানাল কলকাতা হাইকোর্ট।
দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাধারণত মৃত ব্যক্তির বয়স, আয় ও ভবিষ্যতে সেই ব্যক্তির আয়বৃদ্ধির সম্ভাবনার মতো একাধিক ক্ষেত্রেকে তূল্যমূল্য বিচার করা হয়। এছাড়া দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানের মতো বিষয় থাকে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মৃত ব্যক্তির অসবধানতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটেনি, এমনটা প্রমাণ হলে সাধারণত ওই ব্যক্তির আয়ের নিরিখেই ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। কিন্তু পশ্চিম মেদিনীপুরের এক পরিবারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরাসরি এই ফর্মুলায় বিচারপ্রক্রিয়ার দিকে হাঁটেননি বিচারপতি বিশ্বরূপ চৌধুরী।
২০২২ সালের ১৬ এপ্রিল নিজের স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে কলকাতা থেকে পশ্চিম মেদিনীপুরে নিজের বাড়ি ফিরছিলেন সমিত সামন্ত। নিজেই গাড়ি চালাচ্ছিলেন সমিত। পাশেই ছিলেন স্ত্রী বর্ণালি। দুই মেয়ে সিঞ্জিনী ও সানভি ছিল পিছনের সিটে। সকাল ৯টা নাগাদ হরিণা বাসস্ট্যান্ডের কাছে রাস্তার বামদিক থেকে হঠাৎ একটি লরি দ্রুত গতিতে তাঁদের গাড়িকে ওভারটেক করে। তারপরই গোটা রাস্তায় ধুলোয় ভরে যায়। আর সামনে এগোতেই একটি মিনি ট্রাকে সজোরে ধাক্কা মারে সমিতের গাড়ি। ঘটনাস্থলেই মারা যান সমিত ও বর্ণালি। গুরুতর জখম অবস্থায় বড়ো মেয়ে সিঞ্জিনীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর মৃত্যু হয় তাঁরও! গুরুতর জখম আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যায় ছোটো মেয়ে সানভি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, রাস্তার মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে ছিল ওই মিনি ট্রাকটি। যে কারণে এই দুর্ঘটনা।
পরবর্তীতে ক্ষতিপূরণের দাবিতে আদালতের দ্বারস্থ হয় নাবালিকা সানভি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান, পারিপার্শ্বিক ঘটনাক্রমসহ সমিতের আয় বিবেচনা করে ২ কোটি ১০ লক্ষ ৭৯ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করেন ফাস্ট ট্র্যাক আদালতের অতিরিক্ত জেলা জজ। পাশাপাশি বর্ণালির ক্ষতিপূরণ স্থির হয় ক্ষেত্রে ৯ লক্ষ ১৭ হাজার টাকা। কিন্তু নিম্ন আদালতের এই নির্দেশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় বিমা সংস্থা।
বিচারপতি বিশ্বরূপ চৌধুরীর এজলাসে মামলার দীর্ঘ শুনানির পর প্রমাণ হয়ে যায় ওই মিনি ট্রকটি রাস্তার মাঝ বরাবর দাড়িঁয়ে থাকার কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল। এরপরই সমিতের ক্ষেত্রে নিম্ন আদালত নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের অঙ্কই বহাল করেন বিচারপতি। কিন্তু সানভির মা অর্থাৎ বর্ণালির মৃত্যুর ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণে বিচারপতি স্পষ্ট বলেন, ‘একটি পরিবারে মা বা স্ত্রী যে শ্রম দিয়ে থাকেন কোনো অর্থ মূল্যেই তার অঙ্ক নির্ধারণ করা যায় না। সন্তান ও স্বামীর প্রতি মা বা স্ত্রী বিনামূল্যে যে অমূল্য শ্রম দিয়ে থাকেন অর্থমূল্যে তার যাচাই অসম্ভব। তাঁদের দিবারাত্র পরিশ্রমের মূল্য ঘড়ির কাঁটা ধরেও মাপা যায় না। এককথায়, মা বা স্ত্রীর শ্রমের বিকল্প নেই। এছাড়া মাতৃবিয়োগে সন্তানের মানসিক ক্ষতিও অর্থমূল্যে যাচাই অসম্ভব।’
যদিও এক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক ৯ লক্ষ টাকা ২ লক্ষ টাকা বৃদ্ধির নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি। অর্থাৎ মায়ের মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ হিসাবে বিমা কোম্পানিকে ঘটনার দিন থেকে ৬ শতাংশ সুদসহ ১১ লক্ষ টাকা সানভিকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি।