যশোরের পুজোর ‘ঐতিহ্য’ এখনও অমলিন মধ্যমগ্রামের বোসবাড়িতে, ১২০ বছর আগে বন্যা ঠেকাতে দেবীর শরণ
  • ১০ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বারাসত: নদীর জল কেড়ে নিত ফসল। ভাসিয়ে দিত ঘরবাড়ি। বর্ষা এলেই ভৈরব নদীর তাণ্ডবে আতঙ্কে দিন কাটত বাংলাদেশের যশোর জেলার শুভরাড়া গ্রামের বাসিন্দাদের। সেই দুর্ভোগ থেকে মুক্তির আশায় জমিদারের নায়েবের দ্বারস্থ হন গ্রামবাসীরা। তাঁদের সেই আর্তির সূত্র ধরেই শুরু হয়েছিল দেবীদুর্গার আরাধনা। সময়ের স্রোতে নদীর পাড় ছেড়ে এ বাংলায় চলে আসতে হয়েছে পরিবারের উত্তরসূরিদের। বদলেছে ঠিকানা। কিন্তু বদলায়নি বিশ্বাস। সেই ঠাঁইনাড়া পুজো আজ ১২০ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে মধ্যমগ্রামের বীরেশপল্লির বোসবাড়িতে।

Advertisement

১৯০৬ সাল। যশোরের শুভরাড়া গ্রামের উপর দিয়ে বয়ে চলেছে ভৈরব নদী। বর্ষায় নদীর জল বাড়লে প্লাবিত হত বিস্তীর্ণ চাষের জমি। ক্ষতিগ্রস্ত হত ফসল। জলের তোড়ে বিপন্ন হয়ে পড়ত নদীপাড়ের বসতি। শেষ পর্যন্ত গ্রামবাসীরা সমস্যার কথা জানান জমিদারের নায়েব জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণ বোসকে। কথিত আছে, মানুষের দুর্দশা থেকে মুক্তির কামনায় দেবীদুর্গার আরাধনার পরামর্শ দেন তিনি। সেই থেকেই নিজের রাধাগোবিন্দ মন্দিরে গ্রামবাসীদের নিয়ে দুর্গাপুজো শুরু করেন জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণ। এরপর কেটে গিয়েছে দীর্ঘ সময়। কমেছে নদীর তাণ্ডব। ইতিহাসের নানা বাঁক পেরিয়ে ১৯৪৮ সালে জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণের বংশধররা চলে আসেন বাংলায়। নতুন ঠিকানা হয় মধ্যমগ্রামের বীরেশপল্লিতে। প্রথমে বাড়ির উঠোনে পুজো হত। পরে ১৯৫০ সাল থেকে বাড়ির নাটমন্দিরে শুরু হয় পুজো। যশোরের মাটিতে যে আরাধনার সূচনা হয়েছিল, আজও সেই প্রদীপ জ্বলছে মধ্যমগ্রামের বোসবাড়িতে। রথের দিন কাঠামো পুজোর মধ্যে দিয়ে শুরু হয় প্রস্তুতি। নিয়ম মেনে হয় কলাবউ স্নান, সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর পুজো। কুমড়ো, আখ ও শসা বলি দেওয়ার রীতি রয়েছে এখানে। আলাদা রীতি দশমীতে। এদিন উমার পাতে সাজানো হয় পান্তা ভাত আর কচুশাক। পরিবারের বিশ্বাস ও পরম্পরায় জড়িয়ে থাকা আয়োজন যেন ঘরের মেয়েকে বিদায় দেওয়ার নিজস্ব ভাষা। সেই চিরন্তন প্রার্থনা— ‘আসছে বছর আবার এসো মা।’ পুজোর দিনগুলিতে বোসবাড়ি হয়ে ওঠে পরিবারের মিলনক্ষেত্র। কর্মসূত্রে দেশের নানা প্রান্তে, এমনকি বিদেশে থাকা সদস্যরাও ফিরে আসেন পুরানো ঠিকানায়। একসঙ্গে পুজো দেখা, আড্ডা, খাওয়াদাওয়া আর আনন্দে ভরে ওঠে গোটা বাড়ি। পরিবারের সদস্য প্রণব বোস বলেন, ১২০ বছর আগে বাংলাদেশের যশোর জেলায় আমাদের পূর্বপুরুষরা দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন। সেই ধারা ও ঐতিহ্য মেনে আজও পুজো হচ্ছে। পুজোর দিনগুলিতে খুব আনন্দ হয়। ভৈরবের জল একদিন গ্রামের মানুষের ঘরবাড়ি আর ফসলের জন্য বিপদের কারণ হয়ে উঠেছিল। সেই দুর্দশা থেকেই জন্ম নিয়েছিল দেবী আরাধনার সংকল্প। আজ আমরা নদীর পাড় থেকে বহু দূরে রয়েছি। অন্য ভূগোলে দাঁড়িয়ে এই পুজোই হয়ে উঠেছে আমাদের পরিবারের অহংকার।