সুকান্ত বসু, কলকাতা: অমিতবাবু বলেন, ‘বসন্ত চৌধুরী, মাখনলাল নট্ট, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের মতো গুণী মানুষ দোকানে আসতেন রেডিয়ো নিয়ে। সারিয়ে দিয়েছি। ওঁরা পারিশ্রমিক হিসাবে যে টাকা দিতেন তা খরচ করিনি। যত্ন করে রেখে দিয়েছি একটা বাক্সে।’ বক্তার নাম, অমিতরঞ্জন কর্মকার। লোকে বলে রেডিয়ো দাদা। মহালয়া এলে অনেকের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন বেতার দাদা। রেডিয়ো যাঁরা এখনও শোনেন, তাঁদের কাছে অমিতরঞ্জন পরিচিত নাম। কলকাতায় তাঁর নামডাক কম নয়। অমিতবাবু রেডিয়ো সারান। অনেকে বলেন, তিনি রেডিয়োর ধন্বন্তরি। তাঁর দোকানের রেডিয়োয় মহিষাসুরমর্দিনী চালানো হয়। তা শুনতে এই অঞ্চলের বহু মানুষ ভিড় জমান মহালয়ার ভোরে। অমিতবাবু বলেন, ‘ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ শুনব না... তা কি হয়।’
উত্তর কলকাতার কুমোরটুলি। সেখানে বনমালি সরকার স্ট্রিট। সেখানকারই বাসিন্দা ৭০ বছরের অমিতরঞ্জন কর্মকার। অনেকে ডাকেন, রেডিয়ো ম্যান বলে। কারও পুরানো রেডিয়ো খারাপ হলে লোক মারফত খবর পেলে ঠিকানা নিয়ে ছুটে যান। তাঁর হাতের জাদুতে প্রাণ পায় রেডিয়ো। সে কারণেই জাদুকর বলেন অনেকে। বছরের অন্যান্য সময় ভিড় থাকে। তবে মহালয়ার আগে দাঁড়ানোর জায়গা থাকে না দোকানে। মহালয়ার আগের দিন কথা হচ্ছিল প্রবীণ মানুষটির সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গত একসপ্তাহ ধরে প্রতিদিন কমকরে ৩৫টি রেডিয়ো মেরামত করছি। দোকান বন্ধ করতে রাত হয়ে যাচ্ছে। এই সপ্তাহে মারাত্মক চাপ।
৬০ বছরের পুরানো এই দোকান। অমিতবাবুর বাবা শান্তিরঞ্জন কর্মকার শুরু করেছিলেন। অমিতবাবু জানান, তাঁর সংগ্রহে আছে বহু পুরনো রেডিয়ো। যত্ন করে রেখেছেন সেটিকে। আছে ১৯৪০ সালের ভালভ রেডিয়োর মতো বহু নামীদামি কোম্পানির জিনিস। গোয়াবাগানের বাসিন্দা সমীরণ পাল বলেন, ‘বাড়ির রেডিয়োটি খারাপ হলে এই মানুষটির কথাই মনে পড়ে।’ সিঁথির বাসিন্দা সোনালি দে বলেন, ‘খারাপ হওয়া রেডিয়ো নিয়ে এলে সেটি পুরোপুরি খুলে ফেলেন। দেখে মনে হয়, আর জোড়া যাবে না। তারপর জাদু হয়। কিছুক্ষণ পর চলতে শুরু করে রেডিয়ো।’ ক্রেতা তনিমা ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমার মনে হয়েছে উনি বিশ্বকর্মা।’
অমিতবাবুর কাছে রয়েছে বহু দুষ্প্রাপ্য রেকর্ডের সংগ্রহ। সময় পেলে সেগুলি চালান। গান শোনেন। পাড়ার কয়েকজন সেদিন তাঁর দোকানে বসেন হারিয়ে যাওয়া গানের টানে। এভাবেই দিন কাটে অমিতরঞ্জনের। শুধু ঠাকুর নয়, কুমোরটুলি অমিতবাবুর জন্যও বিখ্যাত।
রেডিয়োর ‘বিশ্বকর্মা’ অমিতরঞ্জন।- নিজস্ব চিত্র



