নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: হাড়কাটা গলি। এই যৌনপল্লির চেহারা পাল্টে এক রূপান্তরের গল্প। বউবাজার অঞ্চলের ‘অন্ধকার গলি’ প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিট রঙিন হয়ে উঠেছে কলকাতার ইতিকথায়, যা অচিরেই হয়ে উঠতে চলেছে অন্যতম ‘ফটোজেনিক’ পাড়া। মধ্য কলকাতার সরু অলি-গলির মধ্যে একটি নাম শুনলেই আঁতকে উঠতে হয়—হাড়কাটা গলি। নামের মধ্যেই এক অদ্ভুত ভৌতিকতা। আসলে এই নামের পেছনে লুকিয়ে আছে অনেক স্তর—লোককথা, পেশার ইতিহাস আর সমাজের অন্ধকার দিক।
প্রাচীন কাহিনি বলে, এই গলিতে একসময় ছিলেন এক রহস্যময় হাড়কাটা ডাক্তার। তিনি নাকি মৃতদেহের হাড় কেটে নানারকম পরীক্ষানিরীক্ষা করতেন। জায়গাটি ধীরে ধীরে পরিচিত হয় হাড়কাটা গলি নামে। তবে শুধু এই কাহিনিই নয়। ইতিহাসবিদদের মতে, এখানে একসময় বসবাস করতেন এমন সব কারিগররা যাঁরা হাড় কেটে চিরুণি, খেলনা কিংবা ছোটোখাটো অলঙ্কার তৈরি করতেন। সেই সময়ে হাড় ছিল সহজলভ্য উপাদান। আর তাঁদের কাজ শহরে যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল। তাই বলা চলে, গলির নাম আসতে পারে এই হাড়কাটা কারিগরদের পেশা থেকেও। কিন্তু রহস্য এখানেই শেষ নয়। সময়ের সঙ্গে এই গলি আরও এক পরিচয়ে কুখ্যাত হয়ে ওঠে। এটি দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত ছিল কলকাতার অন্যতম প্রাচীন যৌনপল্লি হিসেবে এবং আজও সেই চিহ্ন টিকে আছে। রাত নামলেই অলি-গলির ভিতর জেগে ওঠে অন্য এক দুনিয়া—যেখানে মিশে থাকে বেঁচে থাকার সংগ্রাম আর সমাজের অন্ধকার বাস্তব।
কিন্তু এই গলি বর্তমান নাম পেয়েছে, সেই যুগের বড়ো জমিদার, আইনজীবীর নামে। প্রেমচাঁদ বড়াল ছিলেন সেই যুগের বড়ো আইনজীবী। তাঁর নামেই পরবর্তীকালে এই রাস্তার নামকরণ হয়। কিন্তু দিনে-রাতে এই পথে ঘুরে বেড়ানো মায়াপরীরা, জায়গাটিকে কালে-দিনে অন্যরকম করে তুলেছেন। কিন্তু ক’জন আর মনে রাখে এই পথের ইতিহাস! তাই এই অঞ্চলের দুর্গামাঠকে কেন্দ্র করে আশপাশের পাঁচিল, ঘরবাড়ি দেওয়াল সাজিয়ে তোলা হয়েছে ‘কলকাতার ইতিকথা’য়। সেই ইতিহাসকে মনে করাতেই এই নতুন প্রয়াস, বলে জানাচ্ছেন ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার বিশ্বরূপ দে। তিনি জানান, প্রেমচাঁদ বড়ালের পুত্র রায়চাঁদ বড়াল ছিলেন সংগীতের কিংবদন্তি। প্রথম দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার পেয়েছিলেন। লতা মঙ্গেশকর থেকে কিশোর কুমার তাঁর কাছে আসতেন উত্তর কলকাতার এই গলিতেই। এ এন দাস, সেই যুগের পোর্ট্রেট শিল্পী। তিনি প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিটে থাকতেন। ডক্টর জগবন্ধু বসু, ভারতের দ্বিতীয় ডাক্তার অব মেডিসিন, তিনিও ছিলেন এই অঞ্চলের বাসিন্দা। হরিশ সিকদার চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের অন্যতম কিংবদন্তি বিপ্লবী। এমন অসংখ্য মানুষের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিটে। বিশ্বরূপবাবুর কথায়, ‘এই অঞ্চলের গর্বগাথা, সবকিছু মিলিয়ে কলকাতার ইতিহাস ফুটে উঠেছে রঙিন ছবিতে। সেই সঙ্গে উত্তর কলকাতার প্রথম বাংলা ভাষা শহীদ স্মারকস্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে।’ পতিতাপল্লি হিসেবে নয়, কলকাতার ‘গর্ব’ এই প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিট, সেটাই জানান দিচ্ছে অঞ্চলের ‘রঙিন’ দেওয়ালগুলি। নিজস্ব চিত্র