রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই মাতুঙ্গার বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়তেন। একটু হেঁটে সোজা হিন্দি সিনেমার প্রথম সুপারস্টার কুন্দনলাল সায়গলের দরজায়। তারপর শুরু হতো রেওয়াজ। কখনও চুপ করে বসে মুগ্ধ নয়নে শুনতেন সায়গলের ভরাট গলা, দরদভরা মীড়। কখনও গলা মেলাতেন নিজেও। তালিম নিয়েছিলেন ছোটবেলা থেকে। একটাই স্বপ্ন ছিল, বড়... অনেক বড় গায়ক হবেন। সিনেমায় প্লেব্যাক করবেন। কিন্তু মানুষ ভাবে এক... তাঁর ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হয়নি। হতে চেয়েছিলেন গায়ক, ভাগ্যের ফেরে হয়ে গেলেন সফল চলচ্চিত্র পরিচালক। একদিক থেকে অবশ্য ভালোই হয়েছিল, নয়তো ভারতীয় সিনেমায় যে এক নতুন ধারার জন্মই হতো না— ‘নয়ার’। তিনি রাজ খোসলা।
গুরু দত্তের সহকারী হিসেবে যখন কেরিয়ার শুরু করছেন, এক বর্ণও হিন্দি লিখতে পড়তে জানতেন না। সেই তিনিই ‘সি.আই.ডি’, ‘কালা পানি’, ‘বোম্বাই কা বাবু’, ‘উও কওন থি’, ‘দোস্তানা’ (অমিতাভ-শত্রুঘ্ন)-র মতো কালজয়ী সিনেমায় বলিউড কাঁপিয়েছেন। ৩৪ বছরের কর্মজীবনে ২৬টি সিনেমা, অধিকাংশই সুপারহিট। চলতি বছর ৩১ মে পূর্ণ হয়েছে তাঁর জন্মশতবর্ষ। সেই উপলক্ষ্যেই এবার কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে আয়োজন করা হয়েছে ‘রাজ খোসলার রেট্রোস্পেকটিভ’। আগামী ৬ নভেম্বর থেকে শুরু হতে চলা সিনেমার এই উৎসবে দেখানো হবে ‘বোম্বাই কা বাবু’, যে ছবিতে দেব আনন্দের বিপরীতে ছিলেন বাংলার মহানায়িকা সুচিত্রা সেন।
বলিউডে আজও রাজ খোসলার সঙ্গে উচ্চারিত হয় আরও দু’টি নাম। দেব আনন্দ এবং গুরু দত্ত। প্রথমজন পারিবারিক বন্ধু, দ্বিতীয়জন মেন্টর। স্বাধীনতার আগেই অবিভক্ত পাঞ্জাব থেকে তৎকালীন বোম্বাই নগরীতে চলে এসেছিল খোসলা পরিবার। রাজের বয়স তখন মাত্র তিন বছর। চারের দশকের শেষে যখন রাজের গায়ক হওয়ার স্বপ্ন ভাঙার মুখে, কাজের খোঁজে নিত্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন, ঠিক সেই সময়ই ত্রাতা হয়ে এলেন বন্ধু দেব আনন্দ। সবে জন্ম হয়েছে তাঁদের প্রযোজনা সংস্থা ‘নবকেতন ফিল্মস’। গুরু দত্ত পরিচালনা করছেন সেই ব্যানারের দ্বিতীয় ছবি, ‘বাজি’। দেবের দাদা চেতন আনন্দ ‘নবকেতনে’ যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন রাজকে। কিন্তু গায়ক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর খোসলা তাতে রাজি হলেন না। আসরে নামলেন দেব আনন্দ। বোঝালেন, ‘গুরু দত্ত আমার বন্ধু। ওর সহকারী হয়ে যাও। ও চাইলে গান গাওয়ার সুযোগ মিলতে পারে।’ আর দ্বিধা করেননি রাজ। ‘ফিল্মমেকিং পড়ছি আর হিন্দি জানি’— মিথ্যা বলেই লেগে পড়েছিলেন গুরু দত্তের সঙ্গে। বছর কয়েকের মধ্যে দেব আনন্দ-গীতা বালিকে নিয়ে পরিচালক হিসেবে প্রথম সিনেমা ‘মিলাপ’। ততদিনে গুরু দত্ত সদয় হয়েছেন। নিজের ভাই আত্মারামকে বাদ দিয়ে রাজের হাতেই তুলে দিয়েছেন ‘সি.আই.ডি’ সিনেমা পরিচালনার দায়িত্ব। প্রথমবার পর্দায় এলেন ওয়াহিদা রহমান। তারপর তো ইতিহাস!
‘সি.আই.ডি’ কলকাতায় মুক্তি পেয়েছিল ১৯৫৭ সালে। প্রবল বৃষ্টিতে সব ফ্লাইট বাতিল। এক পেটি পানীয় নিয়ে ট্রেনে উঠে পড়েছিলেন গুরু দত্ত ও রাজ খোসলা। ৪৬ ঘণ্টার যাত্রা। যতক্ষণে তাঁরা হাওড়া পৌঁছলেন, ততক্ষণে ছবি সুপারহিট! সেই স্মৃতিই কী ফিরে আসবে এবারের চলচ্চিত্র উৎসবে?