কল্যাণকামী রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য থাকে বৈষম্য হ্রাসের আপ্রাণ প্রচেষ্টা। কারণ বৈষম্যই সমস্ত সমস্যার নেপথ্যে। যে-সমাজে যত বেশি বৈষম্য সেই সমাজে গরিব বা নিম্নবিত্ত মানুষের দুর্দশা তত ভয়াবহ। বৈষম্য একটি সংক্রামক ব্যাধি, সময়মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না করা হলে ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। গরিব আরো গরিব হয়। মধ্যবিত্ত শ্রেণি হারিয়ে যায় গরিবের স্তরে নেমে এসে। এবং, ধনী আরো ধনী বা ধনাঢ্য স্তরে উন্নীত হয়। দেশের মোট সহায়-সম্পদের বেশিরভাগটাই মুষ্টিমেয় কিছু পরিবার বা ব্যক্তির কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। বলা বাহুল্য, বৈষম্য হল—‘দারিদ্র-অপুষ্টি-ভগ্নস্বাস্থ্য-অশিক্ষা-বেকারত্ব-বঞ্চনা-অপরাধ’ মিলিয়ে এক ভয়াবহ দুষ্টচক্রের জনক।
যে-দেশ ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’ স্লোগানে আন্তরিক, জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসনে বসতে আগ্রহী, ‘অমৃত ভারত’ নির্মাণে মরিয়া—তার পক্ষে গরিব-মধ্যবিত্তকে বঞ্চনা করা সম্ভব নয়। এই জন্যই খাদ্যের অধিকার, শিক্ষার অধিকার, কাজের অধিকার, সকলের মাথার উপর পাকাছাদ প্রভৃতি নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন মান্য অর্থনীতিবিদগণ। এই সূত্রেই দেশে চালু হয়েছিল—বিনামূল্যে রেশন, মনরেগা, বার্ধক্য ভাতা, বিধবা ভাতা, ভরতুকি মূল্যে রান্নার গ্যাস ও বিদ্যুৎ বণ্টন, ছাত্রবৃত্তি, কর্মসংস্থানে সহায়তা, স্বল্পমূল্যে গৃহঋণ, বিনামূল্যে স্বাস্থ্যবিমা, পাকাবাড়ি প্রভৃতি। এর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় চালু হয়েছিল খাদ্যশ্রী, কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, যুবশ্রী, সবুজসাথী, কৃষকবন্ধুসহ একঝাঁক সামাজিক সহায়তামূলক সরকারি অনুদান প্রকল্প। রাজ্যে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার প্রতিষ্ঠার আগে বিজেপি যে সংকল্পপত্র (ইস্তাহার) প্রকাশ করেছিল তাতে ছিল সামাজিক সহায়তা বৃদ্ধিরই প্রতিশ্রুতি। পাশাপাশি তাদের মৌখিক ঘোষণা ছিল যে, তূণমূল সরকারের কোনো সামাজিক কল্যাণ প্রকল্প তারা বন্ধ করবে না। একাধিক প্রকল্পের নাম বদল হতে পারে মাত্র। বরং কিছু ক্ষেত্রে সহায়তার পরিমাণ ও পরিধি বিস্তৃত হবে। যেমন—মহিলাদের জন্য মাসে দেড় হাজার টাকার ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর জায়গায় শুভেন্দু অধিকারীর জমানায় চালু হবে মাসিক তিন হাজার টাকার ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’। কিন্তু বিজেপির তাবড় নেতাদের ঘোষণার সঙ্গে প্রকল্প রূপায়ণের মিল খুঁজে পাওয়াই এখন দুষ্কর। বিশেষ করে অন্নপূর্ণার টাকা সবাই কবে পাবেন কেউ জানে না। অতীত দুর্নীতির দোহাই পেড়ে ইতিমধ্যেই বেশিরভাগ মহিলাকে রীতিমতো উদ্বেগে রাখা হয়েছে। তাঁদের অ্যাকাউন্টে তিন হাজার টাকা দূর, এক টাকাও ক্রেডিট হয়নি নয়া জমানায়। তার উপর অন্নপূর্ণার ফর্ম নিয়েও বিভ্রান্তির শেষ নেই। ফর্মের চেহারা একাধিকবার বদলে বিভ্রান্তি বেড়েছে। কেউ বলেছেন, ফর্ম ১২ পাতার, আবার কারো কারো হাতে ১৩ পাতার ফর্ম ঘুরতেও দেখা গিয়েছে। অন্নপূর্ণায় ‘প্রবেশ’ অথবা ‘প্রস্থান’-এর কলাম পূরণ করতে গিয়ে আবেদনকারীরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েছেন সবচেয়ে বেশি। তার সঙ্গে রয়েছে ফর্ম জমার অ্যাকনলেজমেন্ট প্রাপ্তি রহস্য!
জনকল্যাণ শিবিরের সংখ্যাও নগণ্য। তৃণমূল জমানায় দুয়ারে সরকার শিবির হত শহর গ্রামের মহল্লায় মহল্লায়। তা নিয়ে প্রচার হত জোরদার। এবার জনকল্যাণ শিবিরের হদিশ পেতেই কালঘাম ছুটেছে নাগরিকদের। তার উপর দিনসংখ্যাও ভীষণ কম। অন্নপূর্ণার মতোই বিতর্ক দেখা গিয়েছে বার্ধক্য ভাতা প্রকল্পের আবেদনপত্র ঘিরেও। প্রথম দিন তো এই প্রকল্পের ফর্মই আসেনি। সেই খবর জানাজানি হতেই দ্বিতীয় দিন তড়িঘড়ি ফর্ম পাঠিয়ে তার বণ্টন শুরু হয়। কিন্তু বিপত্তি তাতেও কমেনি। কারণ, ফর্মের প্রথম পাতায় আবেদনকারীর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লেখার জায়গা রয়েছে। তার ঠিক পিছনের পাতায় ছাপা ‘প্রাপ্তিস্বীকার’ রসিদ বা ‘অ্যাকনলেজমেন্ট’ স্লিপ। ফলে আবেদনপত্র জমা দেওয়ার প্রমাণস্বরূপ সেই রসিদ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বুধবার এমন চিত্র ধরা পড়েছে রাজ্যের একাধিক জনকল্যাণ শিবিরে। আর সেই কারণে বার্ধক্য ভাতার ফর্ম জমা করেও বুক ভরা সংশয় নিয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে প্রবীণদের। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কিছু সংশোধনের চেষ্টা হলেও সুরাহা রয়ে গিয়েছে অধরাই। কৃষক বন্ধুর পরিবর্তে গেরুয়া জমানা যে-প্রকল্পের সুবিধা দেবে বলে জানিয়েছে সেখানেও বঞ্চনাবৃদ্ধির শঙ্কা সর্বত্র। স্বাস্থ্যসাথীর বদলে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ নিয়েও উদ্বিগ্ন বাংলার মানুষ। সব মিলিয়ে যা পরিস্থিতি, তাতে ইতিমধ্যেই অনেকে বলতে শুরু করেছেন, আগেই তো ভালো ছিলাম। এই সরকার একমাসেই এমন পালটি খাবে তা তো দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি! হায় রে, জনকল্যাণ শিবির মাহাত্ম্য!