


শুরুতেই একটি বিতর্কে জড়ালো এরাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকার! গত ৪ মে বিপুল জনাদেশ পেয়ে পালাবদলের পর নতুন সরকারকে ঘিরে যখন রাজ্য সরকারি কর্মী মহলে আশার আলো সঞ্চারিত হতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই মুখ্যসচিবের সই করা একটি নির্দেশিকায় নিষেধাজ্ঞার আড়ালে কর্মীদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই নির্দেশিকায় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সরকারি কর্মী-আধিকারিকদের যোগাযোগের বিষয়ে বেশ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। যার মূল কথা হল, এখন থেকে রাজ্য সরকারের সর্বস্তরের কর্মী-আধিকারিকরা প্রশাসনের লিখিত অনুমতি ছাড়া সংবাদমাধ্যম থেকে গণমাধ্যম— কোথাও মতামত প্রকাশ করতে পারবেন না। নথি-তথ্য আদান-প্রদান করাও যাবে না। সোজা কথায়, সরকারি কর্মচারী হয়ে রাজ্য বা কেন্দ্র কোনো সরকারের বিরুদ্ধেই সমালোচনা নৈব নৈব চ! সরকারের আদেশ মানতে ১৯৫৯ সালের পশ্চিমবঙ্গ গভর্নমেন্ট সার্ভেন্টস কন্ট্রাক্ট রুল, ১৯৬৮ সালের সর্বভারতীয় সার্ভিস কন্ট্রাক্ট রুল এবং ১৯৮০ সালের পশ্চিমবঙ্গ সার্ভিস রুল নামক তিনটি আইনের বিভিন্ন ধারা প্রয়োগের কথা জানানো হয়েছে। অনেকের মতে, নির্দেশিকায় বলা তিনটি আইনই বর্তমানে চালু আছে। নতুন সরকার শুধু আরেকবার তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বিজেপি শাসিত কেন্দ্র ও বিভিন্ন ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের রাজ্যের একাধিক নজির তুলে ধরে অনেকে মনে করছেন, এ হল বাক্-স্বাধীনতা হরণের চেষ্টা। ক্ষমতায় বসেই এই নির্দেশিকা জারির মধ্যে অনেকে তাই ‘সিঁদুরে মেঘ’ দেখছেন।
ঘটনা হল, মুখ্যসচিবের জারি করা আদেশনামায় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ যোগাযোগ, নথি দেওয়া, সংবাদপত্র-সাপ্তাহিকে বিনা অনুমতিতে লেখা, বিতর্ক-সভায় অংশ নেওয়া, মত প্রকাশ সহ যে একগুচ্ছ নিষেধাজ্ঞার কথা বলা রয়েছে, তার অনেকটাই ১৯৮০ সালে, জ্যোতি বসুর আমলে তৈরি আইনেই বলা আছে। ফলে এখন কেন তা নিয়ে কথা উঠছে, সেই প্রশ্নও উঠেছে। এর পালটা যুক্তি হল, ১৯৮০ সালের পশ্চিমবঙ্গ সার্ভিস রুল শুধুমাত্র প্রযোজ্য ছিল সরকারি কর্মচারীদের জন্য। নতুন নির্দেশিকায় তার পরিধি নাকি বাড়িয়ে রাজ্য সরকারের থেকে বেতনপ্রাপক প্রায় সব অংশের কর্মীদের এর আওতায় আনা হয়েছে। আপত্তি উঠেছে ১৯৫৯ সালের আইনটি নিয়ে। এই আইনের যে ধারাগুলির উল্লেখ রয়েছে মুখ্যসচিবের নির্দেশিকায় তাতে নাকি বলা হয়েছে, একজন কর্মচারী তাঁদের সহকর্মীর সঙ্গে সরকারি কাজ নিয়ে মত বিনিময় করতে পারবেন না। অন্য দপ্তরের কর্মীদের সঙ্গেও তাঁর দপ্তরের কাজকর্ম নিয়ে আলোচনা নিষিদ্ধ। বিরোধীদের অভিযোগ, ১৯৫৯ সালের আইনে এই ভয়াবহতা থাকায় ১৯৮০ সালে নতুন আইন বা বিধি চালু হয়েছে। এই আইনেই কর্মচারীদের ট্রেড ইউনিয়ন করা, ধর্মঘট করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। নতুন নির্দেশিকায় তা কেড়ে নেওয়া হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে একথাও ঠিক, নতুন সরকার সবেমাত্র যাত্রা শুরু করেছে। তাই এখনই এই সরকারের কাজকর্ম নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণের সময় আসেনি। কর্মচারীদের অধিকারে আদৌ কোনো হস্তক্ষেপ হচ্ছে কি না তা দেখার জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। সময় দিতে হবে নয়া সরকারকে।
এটাও ঘটনা যে, মমতা সরকারের আমলে বকেয়া ডিএ-এর দাবিতে কর্মচারীদের আন্দোলন রাজপথ থেকে আদালতে পৌঁছেছে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতার সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগের দাবি সহ একাধিক দপ্তরে দুর্নীতি, অনিয়মের অভিযোগে পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে বারবার মুখ খুলেছেন সরকারেরই কর্মচারীরা। বিগত সরকারের বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমে কর্মচারীদের ক্ষোভ উগরে দেওয়ার ছবি দেখা গিয়েছে বহুবার। কর্মচারীদের সেইসব ‘ন্যায্য’ দাবির আন্দোলনে বাম-কংগ্রেস-বিজেপির মতো এরাজ্যের প্রায় সব শাসক-বিরোধী দলই কখনো প্রত্যক্ষ ও কখনো বা পরোক্ষভাবে সমর্থন জুগিয়েছে, রাস্তায় নেমেছে। এখন মুখ্যসচিবের নির্দেশিকায় সেইসব অধিকার, স্বাধীন মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে কি না— সেই বিতর্ক মাথাচাড়া দিতে শুরু করেছে। রাজ্যের নতুন সরকার ইতিমধ্যে তাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি মতো সপ্তম বেতন কমিশন গঠনের কথা ঘোষণা করেছে। আগামী ৩০ মে বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠনের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর। সেই বৈঠকে বকেয়া ডিএ প্রাপ্তি নিয়ে সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপের আশা করছেন সরকারি কর্মচারীরা। কিন্তু এই ‘ফিল গুড’ পরিস্থিতিতে মুখ্যসচিবের সার্কুলার এক বালতি দুধে যেন এক ফোঁটা চোনা ফেলে দিয়েছে। তবে কাগজে-কলমে নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও বাস্তবে তার কতটা প্রয়োগ হয়, তা দেখার জন্য মানুষকে অপেক্ষা করতে হবে। কারণ নতুন সরকার দায়িত্বভার গ্রহণ করেই বলেছিল, এ সরকার হল জনগণের সরকার। এখানে গণতন্ত্র রক্ষিত হবে। আর গণতন্ত্রে বাক্-স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই যে কবি বলে গিয়েছেন, ‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়?’ বর্তমান শাসকেরাও নিশ্চয়ই তা মনে রাখবেন।