Bartaman Logo
১৪ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মৎস্যপুরাণ

‘রুই কত করে রে?’ একটা কেজি দুয়েক ওজনের জ্যান্ত রুইয়ের দিকে তাকিয়ে মাছওয়ালাকে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন মাঝবয়সি ভদ্রলোক।

মৎস্যপুরাণ
  • ২৩ মে, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

স্বস্তিনাথ শাস্ত্রী: ‘রুই কত করে রে?’ একটা কেজি দুয়েক ওজনের জ্যান্ত রুইয়ের দিকে তাকিয়ে মাছওয়ালাকে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন মাঝবয়সি ভদ্রলোক। 

Advertisement

—৪০০ টাকা।
শুনে আঁতকে উঠে ভদ্রলোক বললেন, ‘বলিস কী রে!’
—আপনি নিন না, কমসম করে দেব খ’ন। বাজারে মাছ নেই দাদা। 
—কেন, বিজেপি জিততে মাছগুলো কি ভয়ে গা ঢাকা দিল? সরস মন্তব্য ভদ্রলোকের। পাশে ঝুঁকে পড়ে মাছ বাছছিলেন লুঙ্গি পরা এক প্রবীণ। সোজা হয়ে বললেন, ‘আরে না না, বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ নাগাদ মাছ একটু কমই ওঠে। আরে মোদি তো বইলাই গ্যাছে, এই রাজ্যরে উনি মাছ উৎপাদনে দ্যাশের মধ্যে এক নম্বর করবেন। দ্যাখতে আছেন না, জেতার পর হগ্গলরে মাছ ভাত খাওয়াইতাছে বিজেপি। বিজেপি আইলে মাছ খাইতে দিব না যারা বলতে আছিল, হ্যারা আমাগো ভয় দেখাইতেছিল। আর তাছাড়া মাছ পাইবেন কোইথ থিক্যা, রাইজ্যের নদীনালা, খালবিল, পুকুর হগ্গলই তো বুজাইয়া দিছে। আগের মতো চুনা মাছ পান আর বাজারে? এই যে ইস্টার্ন বাইপাস দ্যাখতে আছেন, হ্যার দুই পাশে তো শুধু ধানখেত আর বড়ো বড়ো পুকুর আছিল। এহন দ্যাখেন খালি উঁচা উঁচা বাড়ি। তা মাছ হইবটা কোইথ থিক্যা?’
প্রবীণ মানুষটি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে যা বললেন, তাতে ভুল নেই এক ছটাকও। ‘সুইচ অন ফাউন্ডেশন’-এর তথ্য ধার করে গুগল জেঠু জানাচ্ছে, ১৯৯১ সাল থেকে ২০২১ সালের মধ্যে পূর্ব কলকাতার জলাভূমির শতকরা 
৩৬ ভাগই গায়েব হয়ে গিয়েছে। কারণ কী? তা নাকি, নগরায়ণ, বেআইনি নির্মাণ ও জলাভূমিকে চাষ জমিতে পরিবর্তন করা। মুর্শিদাবাদে নাকি এই হার আরও বেশি। প্রতিবছর সেখানে শতকরা ২.১ ভাগ জলাভূমি উধাও হয়ে যাচ্ছে। ২০১৭ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ ও নির্মাণ বেড়েছে শতকরা ৪৫ ভাগ। ‘সুইচ অন ফাউন্ডেশন’ আরও জানাচ্ছে, এনফোর্সমেন্ট এজেন্সিগুলোর গড়িমসির জন্যই এই ঘটনা ঘটে চলেছে। ১৯৯১ সাল থেকে ২০২১ সালের মধ্যে পূর্ব কলকাতা জলাভূমির আয়তন 
৬৫ হাজার ৩০০ বর্গ কিলোমিটার থেকে কমে হয়েছে ৪২ হাজার বর্গ কিলোমিটার। 
সত্যিই তো মাছ আসবে কোথা থেকে? কলকাতার 
বাইরে জেলাগুলোতে যান, দেখবেন চূর্ণি, জলঙ্গির মতো নদীগুলোর অস্তিত্বই নেই কোথাও কোথাও। পুরুলিয়ার সাহেব বাঁধ নামের বিশাল জলাধারটিও কচুরি পানায় পরিপূর্ণ। এগুলো থেকেই তো মাছ উৎপাদন হত। যাঁরা 
মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তাঁরা আজ বাধ্য হয়ে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করছেন। চূর্ণি আর জলঙ্গির বুকের উপর বেআইনি নির্মাণ আর চাষের রমরমা। দেখার কেউ নেই। স্থানীয়রা আন্দোলন করেই চলেছেন, কিন্তু তাতে কর্ণপাত করছে কে? 
মূলত এই কারণেই পশ্চিমবঙ্গ মাছ উৎপাদনে পিছিয়ে পড়ছে। এ ব্যাপারে দেশের মধ্যে এক নম্বরে রয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশ। দ্বিতীয় আমাদের রাজ্য। তবে দ্বিতীয় হলেও আমাদের রাজ্যে মাছের উৎপাদন অন্ধ্রের অর্ধেকেরও কম। অন্ধ্রে এক অর্থবর্ষে মাছ উৎপাদন হয় প্রায় ৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন, আর আমাদের রাজ্যে হয় প্রায় ২ মিলিয়ন মেট্রিক টন। অথচ চাহিদার দিক থেকে আমাদের রাজ্য উপরের দিকেই রয়েছে। আর এই চাহিদা মেটাতে পশ্চিমবঙ্গকে অন্ধ্র থেকে বছরে প্রায় ১.২২ লক্ষ মেট্রিক টন মাছ কিনতে হয় প্রতি বছর। অন্ধ্র ছাড়াও তামিলনাড়ু এবং গুজরাত থেকেও মাছ আমদানি করতে হয় আমাদের রাজ্যকে। 
যাঁরা এতদিন বলেছেন যে, বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাঙালিকে মাছ খেতে দেবে না। তাঁদের অবগতির জন্য বলি, পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও গোয়া, ত্রিপুরা, অসম, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্রপ্রদেশ ও কেরলমেও কিন্তু মৎস্যপ্রিয় মানুষের বসবাস আছে। বিশেষত ত্রিপুরা, গোয়া, কেরলম ও অন্ধ্রের প্রায় শতকরা ৯০ ভাগ মানুষই মাছ খান। ওই চারটি রাজ্যের মধ্যে দু’টিতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আছে এবং অন্ধ্রের শাসক দল তেলুগু দেশম পার্টি বিজেপির সঙ্গে জোটে রয়েছে। সত্যিই যদি বিজেপি চাইতো মাছ খাওয়া বন্ধ করতে, তবে এসব রাজ্যের বাসিন্দাদের মাছ খাওয়া এতদিনে লাটে উঠে যেত। ফলে এ কথা স্পষ্ট যে, ভোটের আগে নেহাতই রাজনৈতিক ভাষ্য রচনার খাতিরে এইসব কথা বলা হচ্ছিল। 
আসলে মানুষ কী খাবে, কী পরবে তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে তার ভৌগোলিক অবস্থানের উপর। বাংলা নদীমাতৃক রাজ্য। স্বভাবতই আমাদের রাজ্যের মানুষের প্রধান খাবার যে মাছ হবে তা বলাই বাহুল্য। আজ থেকে নয়, যুগ যুগ ধরে বাংলার মানুষের প্রধান খাবার মাছ-ভাত। সেই ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত মঙ্গলকাব্যগুলির দিকে চোখ ফেরাই, বিশেষত কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর লেখা ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যের দিকে, তাহলে দেখব তাতে কত রকমের যে মাছের পদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। শোল মাছ, কই মাছ, চিতল মাছ, চিংড়ি, সরল পুঁটি, ট্যাংরা, রুই আরও কত কী! উদাহরণ হিসাবে ‘চণ্ডীমঙ্গল’-এর কয়েকটি লাইন তুলে দেওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না। 
‘কটু তৈলে রান্ধে রামা চিতলের কোল।
রুহিতে কুমুড়া বড়ি আলু দিয়া ঝোল।।
কটু তৈলে কই মৎস্য ভাজে গণ্ডা দশ।
মুঠো নিঙাড়িয়া তথি দিল আদারস।।
বদরি শকুল মীন রসাল মুশরি।
পন চারি ভাজে রামা সরল-সফরী।।
কতগুলি তোলে রামা চিংড়ির বড়া।
ছোটো ছোটো গোটা চারি ভাজিল কুমুড়া।।
কিরা দিয়া রুই মুড়া দিল খুল্লনারে।...’
‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যেও দেখি একই চিত্র। অর্থাৎ যুগ যুগ ধরে বাঙালি মাছ খেয়ে আসছে। মাঝে শ্রীচৈতন্যের প্রভাবে বহু বাঙালি পরিবার নিরামিষাশী হয়েছিল, কিন্তু তা ছিল সাময়িক। বাঙালির যুগনায়ক স্বামী বিবেকানন্দ নিজেই ছিলেন আমিষভোজী। শুধু তাই নয়, কেউ কেউ বলেন তিনি নাকি নিরামিষাশীদের দু’ চক্ষে দেখতে পেতেন না। তাঁর পূর্ববঙ্গ নিবাসী শিষ্য শ্রী শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তীকে বলেছিলেন, দু’বেলা মাছ-ভাত খাবি। দেশটা নিরামিষ খাওয়া পেটরোগা বাবাজিতে ভরে গিয়েছে। জবাবে শরচ্চন্দ্র বলেছিলেন, নিয়মিত আমিষ খেলে রজোগুণ বৃদ্ধি পাবে না? বিবেকানন্দ বলেছিলেন, তাই তো চাই। ওইসব সাত্ত্বিক বাবাজিদের ভিতরে আসলে তমোগুণ ভরে রয়েছে। তার থেকে 
রজোগুণ ভালো। বিবেকানন্দ ইলিশ মাছ খেতেও খুব ভালোবাসতেন। যদিও মঙ্গলকাব্যগুলিতে ইলিশ মাছের উল্লেখ পাওয়া যায় না। ফলে ইলিশ কতদিন ধরে বাঙালির রসনায় ঠাঁই পেয়েছে তা জানা বেশ মুশকিল। তবে ইলিশ উৎপাদনেও পশ্চিমবঙ্গ বেশ পিছিয়ে পড়েছে। ২০০০ সালের আগে বছরে প্রায় ৮০ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ ধরা পড়ত এই পোড়া বাংলায়। সেখানে ২০২৩ সালের রিপোর্ট বলছে, তা কমতে কমতে ৬-৭ হাজার মেট্রিক টনে এসে ঠেকেছে। কেন এই পতন? গবেষকরা বলছেন, মূলত ভাগীরথীর মোহনায় পলি জমা, নদীর দূষণ আর খোকা ইলিশ ধরার কারণেই ইলিশ উৎপাদন মার খাচ্ছে আমাদের রাজ্যে। যদিও সাম্প্রতিক অতীতে বেশ কিছু পদক্ষেপ করা হয়েছিল ইলিশকে বাঁচাতে, যেমন এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা, জালের মাপ নির্দিষ্ট করে দেওয়া যাতে ছোটো ইলিশ না ওঠে ইত্যাদি। কিন্তু এই নিয়ম আদৌ মানা হচ্ছে কি না, তা দেখবে কে? নজরদারির যে অভাব রয়েছে তা মানছেন ডায়মন্ডহারবার, কাকদ্বীপ, বকখালির মৎস্যজীবীরা। 
কাজেই মিষ্টি জলের মাছ ও নোনাজলের মাছ, এই দুই ধরনের মাছ উৎপাদনে পশ্চিমবঙ্গকে সেরা করতে গেলে অনেকটা পথই পেরতে হবে রাজ্য সরকারকে। 
বাজারে লুঙ্গি পরিহিত যে প্রবীণ মানুষটির দেখা পেয়েছিলাম, তাঁর মনে অবশ্য এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে নব নির্বাচিত রাজ্য সরকার তা পারবে। প্রায় পাঁচশো গ্রাম মোটা মোটা লোটে মাছ কিনে ফেরার পথে তিনি বলে গেলেন, আমাগো ব্যাদ-পুরাণের দ্যাশ। স্বয়ং বিষ্ণু মাছ সাইজ্যা জীব জগতরে বাঁচাইয়াছিলেন, হেই গল্প জানেন তো? মৎস্যপুরাণে লিখ্যা আছে। তা ভগবান স্বয়ং যেখানে মাছের রূপ ধারণ করেন, হেই দ্যাশের মানুষ মাছ খাইবো না, তা হইতে পারে!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ