Bartaman Logo
১৮ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শিক্ষাকে গুরুত্ব দিক নয়া সরকার

একটা নতুন সরকারের কাছে মানুষ কী চায়? বিগত সরকারের ভুলগুলো যেন নতুন সরকার না করে। পূর্ববর্তী সরকারের উপর তৈরি হওয়া মানুষের ক্ষোভ দূর করলেই সরকার হয় জনপ্রিয়। আর চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলে জন্ম নেয় ক্ষোভ।

শিক্ষাকে গুরুত্ব দিক নয়া সরকার
  • ২৩ মে, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: একটা নতুন সরকারের কাছে মানুষ কী চায়? বিগত সরকারের ভুলগুলো যেন নতুন সরকার না করে। পূর্ববর্তী সরকারের উপর তৈরি হওয়া মানুষের ক্ষোভ দূর করলেই সরকার হয় জনপ্রিয়। আর চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলে জন্ম নেয় ক্ষোভ। ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকে। শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে পূর্ববর্তী সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমেছিল সর্বাধিক। শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির কারণে শুধু শিক্ষিত বেকারদেরই নয়, মাশুল দিতে হয়েছে স্কুল পড়ুয়াদেরও। বছরের পর বছর নিয়োগ বন্ধ থাকায় স্কুলগুলিতে শিক্ষক সংকট চরমে ওঠে। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বহু শিক্ষক দেদার ফাঁকি দিয়েছেন। সরকারি স্কুলের পরিকাঠামো ভেঙে পড়ায় বেড়েছে ইংরাজি মাধ্যম বেসরকারি স্কুলের রমরমা। ছাত্রছাত্রীর অভাবে সরকার পোষিত বহু স্কুল ধুঁকছে। অনেক বন্ধ হয়ে গিয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার হাল ফেরাতে পারবে বিজেপি, এই আশাতেই মানুষ পালটেছে বাংলার সরকার। নতুন সরকারকে পূরণ করতে হবে সেই প্রত্যাশা।

Advertisement

দেড় দশকের তৃণমূল সরকারের পতনের পিছনে বেশ কিছু কারণ আছে। তবে প্রথম সারিতে রয়েছে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি। বারবার নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও সরকার যোগ্য এবং অযোগ্য শিক্ষকদের তালিকা প্রকাশ করেনি। তাতে ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল করেছিল সুপ্রিম কোর্ট। শিক্ষিত বেকাররা মনে করেছিলেন, তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় থাকলে স্বচ্ছ ও সুষ্ঠুভাবে নিয়োগ হবে না। তাই তাঁরা কায়মনোবাক্যে এই সরকারের পতন চেয়েছিলেন। তাঁদের বিশ্বাস, রাজ্যে ডবল ইঞ্জিন সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে নিয়োগ সংক্রান্ত জটিলতা থাকবে না। প্রতি বছর নিয়োগের পরীক্ষা হবে এবং শূন্যপদ পূরণ হবে।
বছরের পর বছর শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় শূন্যপদের সংখ্যা হু হু করে বেড়েছে। তার উপর ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি সুপ্রিম কোর্ট খারিজ করে দেওয়ায় স্কুলের পঠনপাঠন চালানোই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রায় ১৫ হাজার ‘যোগ্য’ শিক্ষক শিক্ষিকাকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিল আদালত। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তাঁদের চাকরি আছে। হাতে আর মাস তিনেক সময়। এর মধ্যে নতুন শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করে তাঁদের পোস্টিংয়ের কাজ সেরে ফেলতে হবে। তা না হলে নতুন করে তৈরি হবে সংকট।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে একাদশ-দ্বাদশ ও নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষক শিক্ষিকা নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা হয়ে গিয়েছে। কিছু বিষয়ের সফল প্রার্থীদের ইন্টারভিউও হয়ে গিয়েছে। কিন্তু, নির্বাচনের প্রায় মাস খানেক আগে থেকে গোটা প্রক্রিয়াটা বন্ধ হয়ে রয়েছে। এর মধ্যে সরকার পরিবর্তন হয়েছে। সরকার গঠন হলেও মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ হয়নি। এখনও মন্ত্রীর সংখ্যা সেই পাঁচ। ফলে অধিকাংশ দপ্তর অভিভাবকহীন অবস্থার মধ্যে রয়েছে। নতুন সরকার যেভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পদাধিকারীদের সরিয়ে দিচ্ছে তাতে আশা করা যায়, পূর্ববর্তী সরকার যে ইন্টারভিউ বোর্ড গঠন করেছিল তারও হয়তো পরিবর্তন হবে। তা হলে 
নতুন বোর্ড গঠন করে ইন্টারভিউয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। তারপর চূড়ান্ত প্যানেল বেরবে। কাউন্সেলিং হবে। সফলদের মেডিকেল ও পুলিশ ভেরিফিকেশন হবে। তারপর তাঁরা নিয়োগপত্র হাতে পাবেন এবং স্কুলে যোগ দেবেন। ফলে গোটা বিষয়টা বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। 
এর মধ্যে আবার নতুন সরকার ২০১৬ সালের শিক্ষক নিয়োগের বিতর্কিত প্যানেল প্রকাশ করেছে। ফলে সেই প্যানেল থেকে জানা যাবে, কারা যোগ্য এবং কারা অযোগ্য। এখন ২০১৬ সালের পরীক্ষায় যাঁরা যোগ্য অথচ এবারে পাশ করতে পারেননি তাঁরা ফের চাকরির দাবি জানাতে পারেন। তাঁরা বলতেই পারেন, ২০১৬ সালের পরীক্ষায় তাঁরা পাশ করেছিলেন। তারপর চর্চার মধ্যে না থাকায় তাঁরা কৃতকার্য হতে পারেননি। সেই দাবি জানালে নতুন করে জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে এখন থেকেই গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি যথাসম্ভব দ্রুত মিটিয়ে ফেলা দরকার। 
তবে, শিক্ষক সংকটের কারণে সরকারি স্কুলের দিক থেকে অভিভাবকরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো অতি সরলীকরণ হয়ে যাবে। বেসরকারি স্কুলের রমরমা শুরু হয়েছিল বাম আমলেই। প্রাইমারিতে ইংরাজি তুলে দেওয়ার সময় থেকেই এরাজ্যে ইংরাজি মাধ্যম ও বেসরকারি স্কুলগুলি শাখাপ্রশাখা বিস্তার করতে শুরু করেছিল। তারপর দিন যত গিয়েছে সর্বভারতীয় পরীক্ষায় সাফল্যলাভের জন্য অভিভাবকদের মধ্যে সন্তানদের বেসরকারি ইংরাজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করানোর প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। 
 তবে, সরকার পোষিত স্কুলগুলিতে শুধু যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ করলেই হবে না। ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর ব্যাপারে শিক্ষকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। এখন যাঁরা চাকরি করছেন তাঁদের প্রচুর ডিগ্রি। জ্ঞানও প্রচুর। কিন্তু স্কুলে পড়ানোর ব্যাপারে তাঁদের অনেকেরই তীব্র অনীহা। সেটা ডিএ বকেয়া থাকার কারণে, নাকি ‘আসি যাই মাইনে পাই’ মানসিকতার জন্য বলা কঠিন। তবে বাস্তব হচ্ছে, বহু শিক্ষকই স্কুলে ছাত্রছাত্রী গেলে রুষ্ট হন। বিশেষ করে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা স্কুলে গেলে অনেক শিক্ষক জানতে চান, ‘কী রে তোদের পড়াশোনা নেই? স্কুলে এসেছিস কেন?’ এর মানে কী দাঁড়ায়? স্কুলে পড়াশোনা হয় না। প্রাইভেট টিউটরের কাছে যা। এই পরিস্থিতির বদল দরকার। তারজন্য দরকার তদারকি। তবে, তদারকি মানে খবরদারি নয়। উপাচার্যকে ঘিরে জোর করে ‘জয় শ্রীরাম’ বলানো নয়।
রাজ্যের নতুন শাসক দলের সবচেয়ে বড়ো সংকট তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা। তারা তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ এবং হিন্দুত্ববাদী হাওয়ার কারণে এরাজ্যে বিপুল সাফল্য পেয়েছে, একথা ঠিক। কিন্তু, বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো লোক নেই। ফলে হু হু করে ঢুকে পড়ছে বেনোজল। তারাই গায়ের জোরে এবং কৌশলে বিভিন্ন এলাকায় কর্তৃত্ব কায়েম করছে। এই সব লোকজনকে দিয়ে তদারকির কাজ করানোটাই বিজেপির কাছে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
বামফ্রন্ট আমলে শিক্ষকদের বেতন ছিল অনিশ্চিত। কয়েক মাস অন্তর একটা কথা শোনা যেত, শিক্ষক 
ও সরকারি কর্মীদের মাইনে দেওয়ার মতো টাকা সরকারি কোষাগারে নেই। বিভিন্ন খাতের টাকায় মাইনে দিয়ে কোনো রকমে পরিস্থিতি সামাল দিত। বাম আমলে মাস পয়লা বেতন কর্মী ও শিক্ষকদের কাছে ছিল কল্পনার অতীত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মীদের মাস পয়লা বেতন নিশ্চিত করেছিলেন। তাঁদের বেতন নিয়ে কোনো দিন দুশ্চিন্তা করতে হয়নি। সরকার শিক্ষকদের বেতন নিশ্চিত করলেও অধিকাংশ শিক্ষক তাঁদের কর্তব্য পালন করেননি। 
যাঁদের স্কুলের সঙ্গে ন্যূনতম যোগাযোগ আছে তাঁরা জানেন, অধিকাংশ স্কুল চালাচ্ছেন পার্শ্বশিক্ষকরা। ঠিক যেভাবে সিভিক ভলান্টিয়াররা রোদের মধ্যে ট্রাফিক সামলান আর পুলিশ ছায়ায় দাঁড়িয়ে থেকে নির্দেশ দেন, একইভাবে স্কুলের ক্লাস নেওয়া থেকে পরীক্ষার খাতা দেখার বেশিরভাগ কাজটাই করানো হয় পার্শ্বশিক্ষকদের দিয়ে। বহু স্কুলে শিক্ষকরা চাঁদা তুলে অতিথি শিক্ষক রেখেছেন। তাহলে স্কুলে শিক্ষকদের সময় কাটে কী করে? বহু শিক্ষকেরই সময় কাটে ফেসবুক আর শেয়ার মার্কেট করে। ‘চাটাই ব্যবসা’ থেকে উপার্জিত টাকা কেউ খাটান জমি ব্যবসায়, কেউ বিনিয়োগ করেন শেয়ারে। অনেকে বলছেন, স্কুলে পড়াশোনার আদর্শ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে গেলে ছাত্রছাত্রীদের মতো শিক্ষক শিক্ষিকাদের ক্ষেত্রেও স্মার্ট ফোন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। নিষিদ্ধ করতে হবে শিক্ষকদের ‘চাটাই ব্যবসা’। এরপরেও স্বীকার করতেই হবে, এখনও অনেক শিক্ষক আছেন যাঁরা ছাত্র অন্তপ্রাণ। আইনি ঝামেলায় পড়তে পারেন জেনেও বদমাইশ ছাত্রদের সন্তানের মতোই শাসন করেন। তাঁরা আক্ষরিক অর্থেই মানুষ গড়ার কারিগর।
নিয়মিত শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় উচ্চশিক্ষার প্রতি ছাত্রছাত্রীরা আগ্রহ হারিয়েছে। মাধ্যমিক ও 
উচ্চ মাধ্যামিক পাশ করে বহু ছাত্রছাত্রী কারিগরি 
ও প্যারা মেডিকেলের মতো ‘প্রফেশনাল কোর্সে’র দিকে ঝুঁকছে। তাতে কলেজে অনার্সের অর্ধেক আসনও ভর্তি হচ্ছে না। একটা সময় ডোনেশন দিয়ে প্রাইভেট বিএড, ডিএলএড কলেজে ভর্তি হত। এখন সেইসব কলেজ ‘চৈত্র সেলের’ মতো ছাড় দিয়েও ছাত্রছাত্রী পায় না। 
এই পরিস্থিতির পরিবর্তন চায় বলেই বাংলার মানুষ ৫০ বছর পর এরাজ্যে ডবল ইঞ্জিন সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। এবার স্বপ্ন পূরণের পালা। সেই আশাতেই বুক বেঁধে নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে রয়েছে গোটা রাজ্য।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ