Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

‘বড়োলোক’ প্রধানমন্ত্রী!

ঘণ্টায় ১ কোটি ২৫ লক্ষ। মোট ১২ ঘণ্টার জন্য খরচ সাড়ে ১৫ কোটি টাকা! বিশ্বের কোনো ধনকুবেরের জন্য নয়। এটা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সৌদি আরব সফরের জন্য ‘সামান্য’ খরচের একটি উদাহরণ মাত্র। ২০২৫-এর ২২ এপ্রিল দু’ দিনের সফরে সপার্ষদ সৌদি আরব গিয়েছিলেন মোদি।

‘বড়োলোক’ প্রধানমন্ত্রী!
  • ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ঘণ্টায় ১ কোটি ২৫ লক্ষ। মোট ১২ ঘণ্টার জন্য খরচ সাড়ে ১৫ কোটি টাকা! বিশ্বের কোনো ধনকুবেরের জন্য নয়। এটা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সৌদি আরব সফরের জন্য ‘সামান্য’ খরচের একটি উদাহরণ মাত্র। ২০২৫-এর ২২ এপ্রিল দু’ দিনের সফরে সপার্ষদ সৌদি আরব গিয়েছিলেন মোদি। ওই দিনই পহেলগাঁওয়ে সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। কঠিন সময়ে দেশবাসীর পাশে দাঁড়াতে সফর কাটছাঁট করে পরের দিন সকালেই দেশে ফেরেন প্রধানমন্ত্রী। ফলে সেদেশে তাঁর সংক্ষিপ্ত সফরের সময়কাল ছিল সাকুল্যে ১২ ঘণ্টা। কিন্তু তাতে সরকারের খরচ কত হল? উত্তর পেতে তথ্য জানার অধিকার আইনে প্রশ্ন রেখেছিলেন এক মানবাধিকার কর্মী। উত্তরে জেড্ডায় ভারতীয় দূতাবাসের তরফে ২৭ জুলাই যে উত্তর দেওয়া হয়েছে তাতে খরচ দেখানো হয়েছে ১৫ কোটি ৫৪ লক্ষ ৩ হাজার ৭৯২ টাকা ৪৭ পয়সা। এর মধ্যে হোটেল ভাড়া ১০ কোটি ২৬ লক্ষ ৩৯ হাজার ৬৫৮ টাকা ৮৮ পয়সা। যানবাহন বাবদ খরচ ৪ কোটি টাকার বেশি অর্থ। এছাড়া রয়েছে বিবিধ খরচ। ওই সমাজকর্মী তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে দূতাবাসের দেওয়া তথ্য সংবাদমাধ্যমে শেয়ার করে লেখেন, কেউ কি মোদিকে বাড়াবাড়ি সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন? ঘটনা হল, মোদিকে কোনো প্রশ্ন করা যায় না। কারণ তিনি সেই সুযোগই দেন না। তিনি শুধু বলেন, বলেই যান। উত্তর দেন না। বলা ভালো, উত্তর দেওয়ার দায় তাঁর নেই। তাই যাঁদের করের টাকায় এই সফর তাঁদের শুধুই নীরবে দেখে যাওয়ার পালা। তাতেই চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার উপক্রম! 

Advertisement

একটা সময় পর্যন্ত ‘হাতি পোষা খরচ’-এর কথা উঠলেই লোকে কটাক্ষ করে রাষ্ট্রপতি ও রাজভবনের উদাহরণ টানত। সাংবিধানিক এই শীর্ষ পদগুলির ঐতিহ্য, রাজকীয় ব্যবস্থাপনাকে যথোচিত মর্যাদায় লালনপালন করতে রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে ফি বছর বিপুল অর্থ খরচ হয়ে যায়। কিন্তু গত এক দশকে প্রধানমন্ত্রী মোদির নিরাপত্তা ও বিদেশ সফরের খরচ যে হারে বেড়েছে, তার সঙ্গে সফরের সংখ্যাও, তাতে হাতিও লজ্জা পাবে! ২০২১ থেকে ২০২৫— এই চার বছরে মোদির বিদেশ সফরের দিকে তাকালেই বিষয়টা পরিষ্কার হবে। সরকারি তথ্য অনুসারে, এই সময়কালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোট ৪৩টি দেশ ভ্রমণ করেছেন। এর মধ্যে আমেরিকা, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও জাপানে চারবার, ফ্রান্সে তিনবার, ব্রিটেন, দক্ষিণ আফ্রিকা, রাশিয়া ও ব্রাজিলে দু’বার করে গিয়েছেন মোদি। সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে ৪৬২ কোটি ৫২ লক্ষ টাকা। গত বছর সবচেয়ে বেশি খরচ হয়েছে ফ্রান্স সফরে (২৫.৫ কোটি টাকা)। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে তিনি প্যারিস গিয়েছিলেন। দ্বিতীয় ব্যয়বহুল সফর আমেরিকা (২০২৩ সালে ‘বন্ধু’ ট্রাম্পের দেশে)। খরচ ২২.৮ কোটি টাকা, তৃতীয় সর্বোচ্চ খরচের সফর সেই আমেরিকাই (১৯.৬ কোটি টাকা)। খরচের বহর ধরলে তাঁর চারটি মার্কিন সফরই সবচেয়ে মহার্ঘ (৭৪.৪ কোটি টাকা), যা চার বছরের মোট খরচের ১৬ শতাংশ। চার বার জাপান সফরে খরচ হয়েছে ৪১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা। তবে পরিহাসের বিষয় হল, গত ১১ বছরে আমেরিকাকে খুশি করতে বারবার শ্যামচাচার দেশে উড়ে গিয়েছেন মোদি। বিনিময়ে কী পেয়েছেন? সেই আমেরিকার সাঁড়াশি চাপেই মেরুদণ্ড বেঁকিয়ে এখন দেশের দরজা ট্রাম্পের জন্য হাট করে খুলে দিতে বাধ্য হয়েছেন মোদি। না, তাঁর এই বিশ্বসফর নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না। তিনি যে ‘বিশ্বগুরু’ সাজতে মরিয়া! 
কোনো সন্দেহ নেই, কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার নামে আগামী দিনে মোদির বিদেশ সফর এই গতিতেই চলবে তো বটেই, বাড়তেও পারে। দৈনন্দিন জীবনযাপনে দেশের গরিব-নিম্নবিত্ত মানুষের যতই নাভিশ্বাস উঠুক, তাঁরা দুবেলা পেট ভরে খেতে পান বা না পান মোদির এই কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে সফরনামা চলতেই থাকবে। অতএব সফরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়বে খরচ, যা আসলে এ দেশের কোটি কোটি মানুষের করের টাকা। এই নিয়েও কোনো বিতর্ক নেই যে বিদেশ সফরের সংখ্যায় ও খরচে অতীতের সব প্রধানমন্ত্রীকে পিছনে ফেলে দিয়েছেন মোদি। হতেই পারে, মানব উন্নয়ন সূচকে এ দেশ ১৯৩টি দেশের ক্রমতালিকায় ১৩০-এ রয়েছে। ক্ষুধা সূচকে ১২৭ দেশের তালিকায় ১০২-এ, মাথাপিছু আয়ে বিশ্বের ১৯০টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৩৬ তম। হতেই পারে, দারিদ্রের মধ্যে বসবাসকারী সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষের বাস (২৩৪ মিলিয়ন) এই দেশেই। শুনে হতাশা আসতে পারে যে, বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী এই দেশ আরো নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশের মেডেল ঝুলিয়ে রেখেছে গলায়। কিন্তু এই হতভাগ্য গরিবের দেশে আমাদের প্রধানমন্ত্রী তো ‘বড়ো-লোক’! তাঁর নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা, ভালো থাকা, পরিবেশ বান্ধব অফিস ও বাসস্থান, বিলাসবহুল বিদেশ সফর এবং এসব সামাল দিতে গৌরী সেনের টাকা! প্রদীপের নীচেটা যতই অন্ধকার থাকুক, তবু তো তিনি ‘ফকির’! গরিবের জন্য মায়াকান্না কাঁদেন! 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ