রাহুল চক্রবর্তী ও নির্মাল্য সেনগুপ্ত, বালুরঘাট: সোমবারের পর মঙ্গলবার। ফের এসআইআর প্রক্রিয়ায় ফর্ম-৬ নিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে চক্রান্তের অভিযোগ তুললেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার নির্বাচন কমিশনে গিয়ে তিনি সরাসরি অভিযোগ করেছেন, ৩০ হাজার ফর্ম ৬ অনৈতিকভাবে বিজেপি জমা দিয়েছে। ঠিক তারপর দিন বালুরঘাটে নির্বাচনি জনসভা থেকে তৃণমূল সেনাপতি অভিযোগ করলেন, ৮০০ ফর্ম নিয়ে ফের বিজেপি হাজির হয়েছে কমিশনে।
মূলত অনৈতিকভাবে ভিন রাজ্যের মানুষের নাম পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে বিজেপি ভোট বাক্সে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চাইছে বলে অভিযোগ তৃণমূলের। গোটা এই পর্বটিকে তৃণমূল আখ্যা দিয়েছে, ‘ভোট চোর’। কীভাবে এই ‘ভোট চুরি’ হচ্ছে, তার গোপন বিষয়টি ধরে ফেলা গিয়েছে বলে দাবি তৃণমূলের। সেই প্রেক্ষাপটেই উঠে এসেছে ভোটার তালিকার প্রসঙ্গ। বাংলার ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে অন্য রাজ্যের ভোটারদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সবরকম চেষ্টা বিজেপি করছে বলে অভিযোগ। এই আবহে মঙ্গলবার বালুরঘাট টাউন ক্লাব ময়দানে জনসভায় তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বিহার ও উত্তরপ্রদেশ থেকে অবৈধভাবে লোক এনে বাংলার ভোটার তালিকায় নাম তোলার চেষ্টা চলছে। মঙ্গলবারও আমি খবর পেয়েছি যে, বিহারের ৮০০ জন অবৈধ ভোটারকে যুক্ত করা হয়েছে মেদিনীপুরের ভোটার তালিকায়। পরে সামাজিক মাধ্যমে ভিডিয়ো পোস্ট করে অভিষেক তুলে ধরেন কমিশনের দপ্তরে পড়ে আছে হাজার হাজার ফর্ম। অভিষেকের অভিযোগ, দিল্লি ও মহারাষ্ট্রের পর এখন বিজেপি বাংলায় আসল ম্যাচ খেলতে নেমেছে। মহারাষ্ট্রে ৫ বছরে ৪৩,৮৪,৮১৪ জন ভোটার যোগ করা হয়েছে, এবং মাত্র ৫ মাসে আরো ৪০,৮১,২২৯ জন যোগ করা হয়েছে। দিল্লিতে ৪ বছরে ৪,১৬,৬৪৮ জন ভোটার যোগ করা হয়েছে, এবং মাত্র ৭ মাসে
আরো ৩,৯৯,৩৬২ জন যোগ করা হয়েছে। আমি তখন সতর্ক করেছিলাম যে আসল কারচুপি ইভিএম-এ নয়, ভোটার তালিকায়। বাংলা এখন ঠিক তারই সাক্ষী হচ্ছে।
এখানেই শেষ নয়। এদিন তৃণমূলের তরফে ভিডিয়ো প্রকাশ করে দেখানো হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের দপ্তরে বান্ডিল বান্ডিল ফর্ম ৬ নিয়ে প্রবেশ করছেন জনৈক ব্যক্তি। ওই ব্যক্তি বিজেপির কর্মী বলে অভিযোগ তৃণমূলের। ছবি, ভিডিয়ো তুলে ধরে রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজা বলেন, আমরা খবর পেয়েছি মুর্শিদাবাদে ২০০, মেদিনীপুরে ৮০০, সন্দেশখালিতে ২০০০ ফর্ম ৬ পূরণ করে জমা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ভাটপাড়া, ডোমজুড়, গাইঘাটা, রাজারহাট-গোপালপুর অঞ্চল থেকেও প্রচুর সংখ্যক ফর্ম ৬ বিজেপি জমা দিয়েছে। এরা সব বিহার, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাতের ভোটার।
এদিকে এসআইআর প্রক্রিয়ায় মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রতিবাদে বাংলার সব মানুষকে বিজেপির বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন তৃণমূল সেনাপতি। ভোট বাক্সেই বিজেপিকে মোক্ষম জবাব দেওয়ার ডাক দিয়েছেন তিনি। বিজেপির গড়ে দাঁড়িয়ে অভিষেকের বার্তা, ইভিএমে জোড়াফুলের বোতাম এমনভাবে টিপতে হবে, যাতে মোদিবাবুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যায়। বিজেপির বাংলা বিরোধী খেলা শেষ করতে হবে। অভিষেকের সংযোজন, বিজেপি বাংলায় এমন এক পরিবর্তন চায়, যেখানে তারা বিহার ও উত্তরপ্রদেশের ভোটার যোগ করে আপনাদের পাড়ার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধ্বংস করবে। তারা এমন এক পরিবর্তন চায়, যেখানে দিল্লির নেতারা ঠিক করে দেবেন, আপনারা কী খাবেন। তারা বলে ‘পালটানো দরকার’, কিন্তু তারা যদি সত্যিই বাংলার ভালো চায়, তবে রাজ্যের পাওনা ২ লক্ষ কোটি টাকা ছেড়ে দেওয়া উচিত। তারা যদি তা করে, তবে তৃণমূল কংগ্রেস তাদের সমস্ত প্রার্থী প্রত্যাহার করে নেবে।
এদিন বালুরঘাট যেখানে অভিষেক সভা করেন সেটা বিজেপি সাংসদ সুকান্ত মজুমদারের সংসদীয় এলাকার মধ্যে পড়ে। এমনকি বালুরঘাটের বিধায়কও বিজেপির। কিন্তু বালুরঘাট শহরের প্রাণকেন্দ্রে অভিষেকের সভায় যে সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ছিল, তা নতুন রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণের ইঙ্গিত দিয়েছে।