সুমন মুখোপাধ্যায়, সিউড়ি: বীরভূম জেলাজুড়ে মা কালীর পুজোর নানা কাহিনি ছড়িয়ে আছে। তারই মধ্যে ব্যতিক্রমী দুবরাজপুরের এক কালীপুজো। দুবরাজপুর পুরসভার ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন শ্মশানকালী। নিশিরাতে গর্ভগৃহ অন্ধকার করে দরজা বন্ধ করে বস্ত্রহীন হয়ে কাঁটার আসনে বসে পুরোহিত পুজো করেন শ্মশানকালীর। ভোগ হিসেবে মাকে দেওয়া হয় পোড়া চ্যাং মাছ ও কারণ (মদ)। এই পুজো দেখতে পান না কোনো ভক্তই। সেই সময় অন্ধকার ঘরে জ্বলে একটি ঘিয়ের প্রদীপ ও একটি তেলের প্রদীপ। মায়ের মূর্তি সারা বছরই থাকে মন্দিরে। রীতি মেনে দুর্গাপুজোর একাদশীর দিন বিসর্জনে যান মা শ্মশান কালী। এক সময় এখানে জঙ্গলে ঘেরা জনবসতিশূন্য এলাকা ছিল। দিনের বেলাতেই মানুষজন আসতে ভয় পেতেন এখানে। কালের নিয়মে এখন আর জঙ্গল নেই, গড়ে উঠেছে জনবসতি। মৃতদেহ সৎকার করার শ্মশানও সরে গিয়েছে পাহাড়েশ্বরের কাছে। কিন্তু আজও এ শ্মশানের রীতি মেনে পূজিত হয়ে আসছে শতাব্দী প্রাচীন শ্মশানকালী। সেবাইতদের থেকে জানা গিয়েছে, সময়ের পরিবর্তন হলেও মায়ের মূর্তি গড়া থেকে পুজোর অন্যান্য রীতি, কোনো কিছুরই পরিবর্তন হয়নি। শ্মশানকালী মন্দিরের চত্বরে রীতি মেনে কালীমূর্তি তৈরি করার জন্য একটা গর্ত করা হয়। সেই গর্তের জলেই শ্মশানে মায়ের মূর্তি তৈরি হয়। পাথুরে এই এলাকায় কোথাও জল না পাওয়া গেলেও এখানে কিন্তু এই সময়ে জল দেখতে পাওয়া যায়। এটাকে গঙ্গা কুণ্ড বলা হয়। এই গঙ্গা কুণ্ডের জল কালী প্রতিমা সম্পূর্ণ হয়ে গেলে নিজে থেকেই শুকিয়ে যায়। শ্মশানে মাকে তৈরির সময় আট অঙ্গে শ্মশান থেকে আনা মৃত মানুষের হাড় দেওয়া হয়। প্রতিমা শুকানোর জন্য শ্মশান থেকে আনা অঙ্গার ব্যবহার করা হয়। মায়ের দু’ পাশে থাকেন ডাকিনি ও যোগিনী। সূর্যাস্তের আগে মায়ের চক্ষুদান হয়। দুর্গাপুজোর ত্রয়োদশীর দিন থেকে মূর্তি তৈরিশুরু হয়। দুর্গাপুজোর পরের দিন অর্থাৎ একাদশীর দিন রীতি মেনে শ্মশানে কালীর বিসর্জন করেন দাস পরিবারের লোকেরা। প্রথা মেনে বিসর্জনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মায়ের কাঠামো তুলে নিয়ে আসা হয় পুকুর থেকে। এই শ্মশানে মা কালীর মূর্তি তৈরি করেন বৈষ্ণবরা এবং তারাই কালী পুজো সহ সারা বছর শ্মশানে মায়ের পুজো করেন। মৃৎশিল্পী তথা পুরোহিত সাহেব দাস বৈষ্ণব বলেন, মায়ের মূল পুজো কোনো ভক্তই দেখতে পান না। আমরা বৈষ্ণব হলেও পুজো হয় তন্ত্রমতে। নিশিরাতে ঘর অন্ধকার করে কাটার আসনে বসে উলঙ্গ হয়ে মায়ের পুজো করা হয়। সেইসময় শুধু একটি ঘিয়ের ও একটি তেলের প্রদীপ জ্বলে। রীতি মেনে মাকে তৈরি থেকে শুরু করে মায়ের পুজো সমস্ত জিনিসপত্রই শ্মশান থেকেই নিয়ে আসতে হয়। মূর্তি তৈরি থেকে শুরু করে সারা বছর শ্মশানে মা কালীর পুজোও করেন এই বৈষ্ণব পরিবারই। পুজো হয়ে যাওয়ার পর ভক্তরা হোম, যজ্ঞ ও আরতি সবই দেখতে পান। শ্মশানে মা কালীকে বিশেষ ভোগ হিসেবে চ্যাং মাছ পোড়া ও কারণ বা মদ দেওয়া হয়। যা ভক্তরা মহাপ্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করেন। সারা বছরই শ্মশানে মা কালী এই মন্দিরে থাকেন এবং রীতি মেনে দুর্গাপুজোর পর একাদশীর দিন বিসর্জন করেন এলাকার দাস পরিবারের লোকেরা। কালীপুজোর দিনে দুবরাজপুর ছাড়াও আশেপাশের বহু এলাকা থেকে ভিড় জমান ভক্তরা।



