নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া: চার চারখানা এস্টেটের দায়িত্ব পাওয়া বাবুয়ানা আর নেই। জমিদারিত্বের দিন ফুরিয়েছে কবেই। শুধু রয়ে গিয়েছে জরাজীর্ণ জমিদার বাড়িখানা। সেটুকুই আঁকড়ে রয়েছেন বলরাম পালচৌধুরী। জৌলুস হারালেও আজও তাঁর হাত ধরেই গড়ায় শতবর্ষ পুরনো রথের চাকা। হাওড়ার বেলগাছিয়ার রথতলায় যে বাড়িতে পা রেখেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, বর্তমানে সেই বাড়ির রথযাত্রা হারিয়েছে কালের কৌলিন্য।
পালচৌধুরী বাড়ির রথযাত্রা ২৮০ বছরের পুরনো। বাড়ির পূর্বপুরুষ রামনারায়ণ পালের ছেলে মধুসূদন পাল কানপুর থেকে চলে এসেছিলেন হাওড়ায়। তিনি ব্রিটিশদের কাছ থেকে চারটি এস্টেটের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। সেই সঙ্গে ‘চৌধুরী’ খেতাবও মিলেছিল। তখন থেকেই এই জমিদার পরিবার পালচৌধুরী হিসেবে পরিচিতি পায়। মধুসূদন ও তাঁর তিন ভাই শিবনাথ, ব্রজনাথ ও বেণীমাধবের হাত ধরে পালচৌধুরী বাড়িতে শুরু হয় রথযাত্রা। জানা গিয়েছে, ২৮ ফুটের সুউচ্চ রথে চেপে যখন জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরাম মাসির বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিতেন, তখন সেই শোভাযাত্রায় অংশ নিতেন হাজার হাজার মানুষ। ঢাক, ঢোল, কাঁসর বাজিয়ে, বাতাসা ছিটিয়ে রথ চলত রথতলা থেকে বেলগাছিয়া পর্যন্ত। সেই সঙ্গে রাস্তার দু’পাশে প্রচুর দোকানপাট বসত। উল্টো রথ পর্যন্ত চলত সেই মেলা। কথিত আছে, বেণীমাধবের সময়ে নাকি পালচৌধুরী বাড়িতে পা রেখেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাড়ির ঠাকুর দালানের পাশে নাটমঞ্চে নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন তিনি।
এই বাড়িতে পা রেখেছেন আরও অনেক ব্যক্তিত্ব। এসেছিলেন প্রখ্যাত ফুটবলার শৈলেন মান্নাও। রথযাত্রার তিনদিন আগে মঙ্গলবার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি দেখতে দেখতে কথাগুলি বলছিলেন বাড়ির বর্তমান প্রজন্মের সদস্য বলরাম পালচৌধুরী। বয়স প্রায় ৭০। বলেন, ‘যতদিন বেঁচে থাকব, আমার হাত ধরেই এই বাড়ির রথযাত্রা হবে। জানি না পরবর্তী প্রজন্ম এটাকে বহন করতে পারবে কি না।’ বলরামবাবু জানান, এই রথটি ২৮০ বছরের পুরনো। ব্রিটিশ আমলের ভারী লোহার চাকা। এই রথ টানতে একশোরও বেশি মানুষের প্রয়োজন হয়। রথতলা মাঠের পাশেই বছরভর রাখা থাকে এটি। রথযাত্রার একমাস আগে বাড়ির দালানে নিয়ে এসে সংস্কারের কাজ করা হয়। নতুন রং চড়ে রথে। এখন সেসব কাজই করা হচ্ছে। আর দু’দিন বাদেই দূর-দূরান্ত থেকে আসা আত্মীয়-স্বজনের ভিড়ে গমগম করবে পালচৌধুরী বাড়ি। ভগ্নদশার ঠাকুর দালান ও নাটমঞ্চ এভাবেই যেন প্রতি রথযাত্রায় ফিরে যায় জমিদারিত্বের পুরনো সময়ে।