Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

রানাঘাটের সবচেয়ে প্রাচীন শর্মা বাড়ির পুজো হয় পাঁচবাড়ি থেকে ভিক্ষে করে

‘সব জায়গায় তো মায়ের মৃন্ময়ী রূপ দেখি। কোথায় গেলে চিন্ময়ী রূপ দেখতে পাব?’ রাজসভা পরিচালনার সময় মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র নাকি কোনও এক সভাসদকে জিজ্ঞেস করেছিলেন।

রানাঘাটের সবচেয়ে প্রাচীন শর্মা বাড়ির পুজো হয় পাঁচবাড়ি থেকে ভিক্ষে করে
  • ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

দীপন ঘোষাল, রানাঘাট: ‘সব জায়গায় তো মায়ের মৃন্ময়ী রূপ দেখি। কোথায় গেলে চিন্ময়ী রূপ দেখতে পাব?’ রাজসভা পরিচালনার সময় মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র নাকি কোনও এক সভাসদকে জিজ্ঞেস করেছিলেন। পরে সেই সভাসদের মুখে রানাঘাটের ‘বুড়োমা’র পুজোর কথা শুনে ছুটে এসেছিলেন কৃষ্ণনগরের রাজা। রানাঘাটের শর্মা বাড়ির পুজো তাই শুধুমাত্র মাতৃ আরাধনাই নয়, এলাকার ইতিহাসও বটে। এটিই এলাকার প্রাচীনতম পুজো।

Advertisement

ঠিক কবে থেকে এই পুজোর শুরু, তার কোনও লিখিত প্রামাণ্য নথি মেলেনি। ঐতিহাসিকদের মতে, এটিই রানাঘাটের প্রাচীনতম পুজো। যদিও পরিবারের লোকজনদের দাবি, বুড়োমা পুজোর বয়স প্রায় ৭৬৪ বছর। ১২৬২ সালে চাঁচোল থেকে তৎকালীন ব্রহ্মডাঙায় এসে রামকুমার চক্রবর্তী এই পুজোর সূচনা করেন। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। কেবলমাত্র এক পালিতা কন্যা ছিল। পরবর্তীকালে ওই পালিতা কন্যার দুই কন্যাসন্তান হয়। তাঁদেরই এক মেয়ের বর্তমান প্রজন্ম শর্মা বাড়ির সদস্যরা। সূচনাকালে দেবীর মূর্তি পুজোর প্রচলন ছিল না। তখন ঘটেই পুজো হতো। যদিও পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে মূর্তি পুজোর প্রচলন হয়। অন্য সব জায়গার জমিদার বাড়িতে ঠাকুরদালান, সিংহদুয়ার অথবা প্রকাণ্ড অট্টালিকা থাকলেও শর্মাবাড়ি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী। প্রাচীনতম পুজো হলেও এখানে প্রকাণ্ড অট্টালিকা কোনওদিনই ছিল না। বরং সেই যুগে তাঁরা আর্থিকভাবে দুর্বলই ছিলেন। বর্তমান প্রজন্ম আর্থিক স্বচ্ছলতার মুখ দেখার পর তৈরি হয়েছে রাজকীয় ঠাকুরদালান।
ব্যতিক্রমী নিয়ম-নীতির চেয়েও চিত্তাকর্ষক রানাঘাটের এই পুজোর ঐতিহাসিক কাহিনী। বর্তমান প্রজন্মের সৌরভ শর্মাচৌধুরী বলেন, প্রথম থেকেই নিয়ম ছিল ভিক্ষে করে পুজোর সংস্থান করতে হবে। এখনও আমরা সেই রীতি বজায় রেখেছি। তবে পুরো সংস্থান এখন ভিক্ষে করে হয় না। প্রথমে পাঁচটি বাড়িতে ভিক্ষে করে যা জোগাড় হয়, সেটিই পুজোর প্রথম অর্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। পূর্বপুরুষদের কাছে শুনেছি, মায়ের চিন্ময়ী রূপ দেখে অভিভূত হয়ে যান রাজা কৃষ্ণচন্দ্র। তখন তিনি নাকি প্রতিমার একটি আঙুল কেটে দেখতে চান, সত্যিই মা এখানে বিরাজমান কি না! শোনা যায়, তখন নাকি মাতৃমূর্তির সেই কাটা আঙুল দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। তা দেখে কৃষ্ণচন্দ্র মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেন। বুড়োমায়ের প্রতি তাঁর অগাধ বিশ্বাস জন্মায়। সৌরভবাবু আরও বলেন, দেবীর নাম কেন বুড়োমা, তার সঠিক উত্তর আমাদের কারও জানা নেই। খোদ রাজা কৃষ্ণচন্দ্রই আমাদের বর্তমান পদবি ‘শর্মাচৌধুরী’ উপাধিরূপে দিয়েছিলেন। আদতে আমাদের পদবি মুখোপাধ্যায় ছিল বলে শুনেছি।
ব্যতিক্রমী কিছু নিয়ম-নীতির মধ্যে অন্যতম শর্মা বাড়ির কাদামাটি খেলা। দুর্গাপুজোর নবমীতে শর্মা বাড়ির ঠাকুরদালান ছাড়াও রানাঘাটের ঘোষবাড়ি, পালবাড়ি, কাঁসারি বাড়ি এবং একটি বারোয়ারি পুজোয় কাদামাটি খেলতে যান পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের সদস্যরা। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, রানাঘাটে প্রথম পাটে ওঠেন বুড়ো মা। চতুর্থীর দিন শর্মা বাড়ির প্রতিমা পাটে উঠলে তারপর সর্বত্র ঠাকুর পাটে তোলা হয়। 
পুজোয় সবচেয়ে আকর্ষণীয় কী? সৌরভ শর্মাচৌধুরী বলেন, প্রথম পুজোয় যে ছাঁচ ব্যবহার করে ঠাকুর তৈরি হয়েছিল, আজও তাতেই বুড়োমা তৈরি হয়। সবচেয়ে আকর্ষণ একটি প্রাচীন তালপাতার পুঁথি। যেই পুঁথির উপর নির্ভর করেই এই পুজো হয়। শোনা যায়, এটিও নাকি প্রায় সাতশো বছরের বেশি প্রাচীন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ