Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

চাঁদের পাহাড় ও ফেলে আসা বইবেলা

ছুটিয়ে ঘোড়া গেলেম তাদের মাঝে/ঢাল তরোয়াল ঝনঝনিয়ে বাজে/কি ভয়ানক লড়াই হল মা যে/শুনে তোমার গায়ে দেবে কাঁটা...কবিতাটা পড়ার পর কত না বায়না, ‘তরোয়াল কিনে দাও।’

চাঁদের পাহাড় ও ফেলে আসা বইবেলা
  • ২৫ মে, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কলহার মুখোপাধ্যায়: ছুটিয়ে ঘোড়া গেলেম তাদের মাঝে/ঢাল তরোয়াল ঝনঝনিয়ে বাজে/কি ভয়ানক লড়াই হল মা যে/শুনে তোমার গায়ে দেবে কাঁটা...কবিতাটা পড়ার পর কত না বায়না, ‘তরোয়াল কিনে দাও।’ এখন যারা বড়ো, যখন তারা ছোটো ছিল, তারা রাংতায় মোড়া ক’খানা তরোয়াল যে পেয়েছিল বায়না করে, এখন হিসেব পাওয়া ভার। সে তরোয়ালের রাংতার মতো চকচকে কল্পনা মাখা ছোটোবেলা ছিল তাদের। তারা ঘুমিয়ে স্বপ্নে হত বীরপুরুষ। তারা দুপুরবেলা একলা ছাদকে বানিয়ে ফেলত আফ্রিকার অরণ্য। পাঁচিলের শ্যাওলা ধরা ফোকরে ব্ল্যাক মাম্বা খুঁজত। ভাঙা আয়নার কাচে রোদ্দুর ফেলে আলোর টেলিগ্রাম পাঠাত পাশের বাড়ির বন্ধুর কাছে।

Advertisement

স্কুল থেকে বাড়ি। বাড়ি থেকে খেলার মাঠ। এই তো ছিল দুনিয়া। তবু তারা কোনোদিন না গিয়েও আফ্রিকার রিখটারসভেল্ট পর্বতমালা চিনত। বাওয়াব গাছ কেমন, জানত। অপুর নিশ্চিন্দিপুর গ্রামটা তাদের বিলক্ষণ চেনা। ব্ল্যাক মাম্বার মতো ভয়ানক সাপকে তারা হেলায় পাশ কাটিয়ে যেতে পারে। চাঁদের পাহাড়ের শংকর তাদের এসব তো সেই কবেই শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছে। তাদের কল্পনা গ্রাম, শহর, দেশ, বিশ্ব ছাড়িয়ে শঙ্কুর সঙ্গে রকেটে চড়ে চলে যায় মহাকাশে। জুল ভের্নের হাত ধরে ঢুকে পড়ে পৃথিবীর পেটে। জার্নি টু দি সেন্টার অফ দ্য আর্থ গুলে খেয়ে নিয়েছে তারা। তার আগে লক্ষ্ণৌ চিনিয়ে দিয়েছেন সত্যজিৎ রায়। বাদশাহী আংটি ততদিনে গোয়েন্দাগিরি ঢুকিয়ে দিয়েছে মজ্জায়। বিমল-কুমার অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ বাড়িয়েই গিয়েছে। ব্যোমকেশ মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছে, বড়ো হয়ে সত্যান্বেষী হওয়ার ভূত। 
বইগুলি সব একই আছে, দোকানে, বাড়িতে, লাইব্রেরিতে। কিন্তু বাঙালির সে বইবেলা একইরকম আছে তো? 
এখন যারা বড়ো যখন তারা ছোটো ছিল, তাদের একটা বইবেলা ছিল। বইয়ের পাতায় ভাসতে ভাসতে কত বেলা যে গ‌঩ড়িয়ে অবেলায় পৌঁছে যেত, সূর্যের আলো নিভে টেবল ল্যাম্পে গিয়ে ঢুকত তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু তখন যারা ছোটো ছিল তারা এখন বড়ো। চকচকে কল্পনা ঘেরা শৈশব তারা পার করে এসেছে। এখন শৈশবের ভার এখনকার ছোটোদের হাতে। সে শৈশব বইয়ের পাতায় কি এখনও দোল খায়? এখনও কি একটা বই পেলে নাওয়া খাওয়া ভুলে লেখার ময়ূরপঙ্খির পাল তুলে ভাসতে ভাসতে অচেনা দেশের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে শিশুরা?
কী যে বলেন! তাদের এখন চাঁদের পাহাড়ে ওঠার সময় আছে নাকি? অত ভারী স্কুল ব্যাগটা পিঠে নিয়ে তারা পাহাড়ে উঠবেই বা কী করে? অনলাইনে পড়া হবে বলে তাদের হাতে এখন মোবাইল। তার ফাঁক গলে রিলসের নেশা স্বভাবে ঢুকে গিয়েছে তাদের। সে নেশার ফাঁক গলে বেরনো কি এতই সহজ? পড়ার চাপে মাঠে গিয়ে ফুটবল খেলারই সময় নেই, তারা কী করে পড়বে বই। 
ফলে বাংলার হেমন্ত ঋতুর মতো গায়েব হয়ে যাচ্ছে বাঙালির শৈশবের বইবেলা। 
শিশুদের কাছে এখন বই মানে খুব বেশি হলে গ্রাফিক নভেল। ক্যাপ্টেন আমেরিকা, গোকু, স্পাইডারম্যান, উলভারিনের ছবির জগতেই বিচরণ তাদের। ফলে শব্দের সিঁড়ি বেয়ে কল্পনার পাহাড়ে ট্রেকিং করা তাদের পক্ষে জলভাত নয়। এছাড়া এলইডি স্ক্রিনের চটকদার কনটেন্ট আড়াল করে রেখে দিয়েছে বইয়ের পাতা। জানার কৌতূহল ঢাকা পড়ে গিয়েছে অ্যালগরিদমের খেলায়। শিশুটি কী পড়বে, কী জানবে, কী ভাববে, সব মেশিনের হাতে বন্দি। কনটেন্ট ক্রিয়েটারদের তৈরি ছবি তার মস্তিষ্কের দখল নিয়েছে। তার আঙুল দ্রুত স্ক্রল করতে শেখে, কিন্তু থেমে কোনো বাক্য অনুভব করতে জানে না। 
আজকের শিশুরা পৃথিবীর হাজার ছবি দেখে, কিন্তু দুনিয়াটাকে অনুভব করতে পারে না। বইয়ে লেখা লাইন দেখে সে কল্পনা করতে শেখে না। তার কল্পনাশক্তির কার্যত দফারফা।
তাই রূপকথার অচিনপুরীর কোনো রাজকন্যার সঙ্গে তার পরিচয় হয়নি। সে কোনোদিন জিয়নকাঠির ছোঁয়ায় কোনো রাজপুত্রকে বাঁচায়নি। চাঁদের বুড়ির চরকায় কাটা মসলিনের জামা তাকে কেউ কোনোদিন দেয়নি। কুমড়োপটাশ হাসলে কী হয়, তার জানা নেই। তার কোনো রাংতার তরোয়াল নেই। তার কোনো চকচকে শৈশবও নেই।
সে ছোটো হয়েও ছোটো নেই। তার ছেলেবেলা গিয়েছে হারিয়ে। তার বইবেলা ভ্যানিস।
অথচ অন্য দিকে তাকালে দেখা যায়, বাঙালি সংস্কৃতিবাগীশ বলে বাকি ভারতের খুব রাগ। বেঙ্গলিরা নাকি খালি বই পড়ে। জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দেয়। পৃথিবীর সব বিষয় নিয়েই তাদের আগ্রহ। তাদের সহজে বোকা বানানো যায় না। তাই রাজনীতিবিদ থেকে বানিয়া সম্প্রদায় বাঙালির উপর ভারি অসন্তুষ্ট। তবে রাগ থাকলেও অশ্রদ্ধা করতে পারে না শুধুমাত্র বাঙালির মেধার জগৎ উন্নত বলে। বাঙালির এই মেধার অন্যতম উৎসই হল বই। ছোটো থেকে বই পড়ে পড়ে সে তার মস্তিষ্কের পুষ্টি ঘটায়। তার মেধা হয় উন্নত। তার যুক্তি হয় শাণিত। তাকে বোকা বানানো সহজ হয় না। বই তাকে আধুনিকমনস্ক করে রেখেছে। তাকে সমৃদ্ধ করে রেখেছে। তাই বাকি দেশের থেকে সে আলাদা। উন্নত। 
সেই বাঙালির ছোটোবেলা ক্রমে সরছে বই থেকে! সে শূন্যস্থানের দখল নিচ্ছে মোবাইল, কম্পিউটার। মস্তিষ্ক ধীরে বশীভূত হচ্ছে কৃত্রিম মেধার কাছে। তার এখন বইবেলা নেই। তার ছোটোবেলা সমঝোতা করে ফেলছে। আর ভবিষ্যতের বড়োবেলা নিশ্চিতভাবে পড়তে চলেছে অস্তিত্বের সংকটে। সকল নিয়ে সর্বনাশের আশায় বসে থাকা বোধহয় একেই বলে...
বাঙালি কিন্তু বাস্তবিকই পড়ুয়া জাত। ‘উনিশটি বার ম্যাট্রিকে সে ঘায়েল হয়ে থামল শেষে...।’ গঙ্গারামের গল্প সুকুমার রায় শুনিয়েছিলেন। সে গল্পে লুকনো কী বার্তা। গবেট গঙ্গারামও হাল ছাড়েনি। আঠারোবার অকৃতকার্য হয়েও উনিশবারের বার বসেছে ম্যাট্রিকে। বই ছেড়ে পালায়নি মোটেও। বইয়ের সঙ্গে বাঙালির বন্ধুত্বে গবেট গঙ্গারামও উদাহরণ।
বাঙালি বাড়িতে একসময় বই ছিল পরিবারের সদস্যের মতো। আলমারিতে সাজানো রবীন্দ্র রচনাবলী, শরৎ রচনাবলী, সুকুমার রায় থেকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, জীবনানন্দ, বিভূতিভূষণের বই। এসব শুধু কাগজ ছিল না, ছিল উত্তরাধিকার। বাবা যে বই পড়েছেন, ছেলে সেই বই পড়েছে, তারপর নাতিও। একটা বইয়ের পাতায় থেকে যায় কত আঙুলের ছাপ, শুকনো ফুল, পুরানো বুকমার্ক, কখনো কারও হাতে লেখা নাম। বইগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে যায় প্রজন্ম। আজ বই হারিয়ে যাচ্ছে মানে পড়ার অভ্যাস শুধু হারাচ্ছে এমন নয়, হারাচ্ছে আবেগও। আর খুব নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছে, সহানুভূতি। যে শিশু গল্প পড়ে না, সে মানুষের কান্না চেনে না। সাহিত্য মানুষকে অন্যের জীবন অনুভব করতে শেখায়। উপন্যাস পড়লে গরিব মানুষের খিদের কষ্ট বোঝা যায়, একা মানুষের নিঃসঙ্গতা বোঝা যায়, মায়ের অপেক্ষার উৎকণ্ঠা বোঝা যায়। সাহিত্য সবাইকে সহানুভূতির উপলব্ধি করায়। একটা উপন্যাস পড়তে পড়তে অন্য মানুষের জীবনে ঢুকে যায় সবাই। বইয়ের লেখা ফুটিয়ে তোলে অন্যের আনন্দ, অপমান, খিদে, প্রেম। তা অনুভব করে পাঠক। তাই বই শুধু শিক্ষিত করে না, মানুষও করে তোলে।
স্ক্রিনের দ্রুত বিনোদন সেই গভীরতা দিতে অক্ষম। তাই এ শুধু অভ্যাস বদলের গল্প নয় বাস্তবে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনেরও গল্প। বই কম পড়া মানে ভাষার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়া। ভাষা যত দরিদ্র হয় চিন্তা ততই সংকীর্ণ হয়।
তবু এখনও কোথাও আশার আলো ফোটে। সব শেষ হয়ে যায় না। 
হয়তো একদিন কোনো বৃষ্টির দুপুরে কারেন্ট চলে যাবে। মোবাইলের চার্জ যাবে শেষ হয়ে। বাচ্চাটা বিরক্ত হয়ে দাদুর বুকশেলফ খুলবে। তার হাতে ধুলো জমা বই। পাতা ওল্টাবে। আর তখন বইয়ের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসবে হারিয়ে যাওয়া এক পৃথিবী। সে পৃথিবীতে কাশবন দুলছে। দূরে ট্রেনের হুইসল শোনা যাচ্ছে। ফেলুদা সিগারেট ধরাচ্ছে। অপুর চোখে বিস্ময়। শিশুটি প্রথমবার বুঝবে, বই শুধু গল্প নয়, বই আসলে অচেনা একটি মানুষ। বৃষ্টির দুপুরে বাচ্চাটির আঙুল আর স্ক্রল করছে না। সে ধীর। স্থির হয়ে পাতা ওলটাচ্ছে বইটির।
বই মানুষকে ধীর হতে শেখায়। ভাবতে শেখায়। অপেক্ষা করতে শেখায়। আজ পৃথিবী দ্রুততার। দশ সেকেন্ডের বেশি মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন। সে দ্রুত পৃথিবীর বৃষ্টিভেজা সে দুপুরে বইয়ের হাত ধরে শিশুটি ধৈর্য শিখছে। সংবেদনশীল, গভীর মানুষ হতে এই ধৈর্যেরই প্রয়োজন, এই ধীরতারই প্রয়োজন।
স্বপ্ন দেখার কোনো সীমানা নেই। শেষ বলেও কিছু নেই।
ভ্যানিস বইবেলা ফিরিয়ে আনতে কোনো একদিন টিভি, মোবাইল দূরে রেখে মা-বাবা হাতে তুলে নেবে বই। তখন সন্তান আগ্রহ পাবে। বইকে পরীক্ষার চাপের বাইরে এনে আনন্দের জায়গায় ফিরিয়ে দিতে হবে বড়োদের। গল্প শোনাতে হবে, বই উপহার দিতে হবে, লাইব্রেরিকে আবার বাঁচিয়ে তুলতে হবে, তখন যারা ছোটো ছিল এখন যারা বড়ো, তাদের। শুধু ভালো ছাত্র নয় ভালো মানুষ হওয়ার পথও দেখাতে হবে সন্তানকে। বইহীন সমাজ হয়তো প্রযুক্তিতে উন্নত কিন্তু ভিতরে ভিতরে অত্যন্ত গরিব।
বই চাই গো বই চাই বই চাই গো...  

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ