Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

ডিজিটাল যুগেও অমলিন বাংলার ঐতিহ্যের হালখাতা

যুগ বদলেছে। সময়ের সঙ্গে বদলেছে মানুষের অভ্যাস, চিন্তাভাবনা, জীবনযাত্রা, এমনকি ব্যবসা করার পদ্ধতিও। কাগজের খাতা আর কলমের জায়গা নিয়েছে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ আর সফটওয়্যার।

ডিজিটাল যুগেও অমলিন বাংলার ঐতিহ্যের হালখাতা
  • ১৫ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সৌমিত্র দাস, কাঁথি: যুগ বদলেছে। সময়ের সঙ্গে বদলেছে মানুষের অভ্যাস, চিন্তাভাবনা, জীবনযাত্রা, এমনকি ব্যবসা করার পদ্ধতিও। কাগজের খাতা আর কলমের জায়গা নিয়েছে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ আর সফটওয়্যার। হিসাব এখন আর খাতায় লিখে রাখা হয় না। এখন সব ডেটা যায় এক ক্লিকে কম্পিউটারে। ডিজিটাল যুগেও হারিয়ে যায়নি বাংলার ঐতিহ্যের হালখাতা। এখন গ্রাম-বাংলার মুদিখানার দোকানে ডিজিটাল বিলিং সিস্টেম চালু হয়েছে। কম্পিউটার ও সফটওয়্যারের মাধ্যমে সহ঩জেই হিসেব রাখা হচ্ছে। এই আধুনিকতার মাঝে হালখাতা তার নিজস্ব ঐতিহ্য বজায় রেখেছে। হালখাতাকে কেন্দ্র করে কোথাও যেন রয়ে গিয়েছে এক টুকরো বাঙালিয়ানা, একটুকরো নস্টালজিয়া, এক টুকরো অনুভূতির ছোঁয়া। কাঁথি থেকে এগরা-সর্বত্রই দোকানে-বাজারে এই ছবি লক্ষ্য করা যায়। 

Advertisement

বছরের অন্যান্য সময় খুব একটা ব্যবহার না হলেও নববর্ষের দিন এলেই হালখাতার গুরুত্ব বেড়ে যায়। পয়লা বৈশাখ মানে নতুন হালখাতার দিন। বাঙালি ব্যবসায়ীদের কাছে এটি শুধু হিসাবের খাতা নয়, একটি আবেগ ও নিরবিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক, শুভ সূচনার রীতি। ডিজিটাল ঝড়ে, প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আজও এই প্রথা টিকে রয়েছে অনেক দোকানে, বাজারে। চৈত্র সংক্রান্তির পরের দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ থেকে বাংলা নতুন বছরের সূচনা হয়। এই দিনটি বাঙালির কাছে আবেগ, ঐতিহ্য ও পরম্পরার মিশেল। পয়লা বৈশাখে লাল শালুর হালখাতায় টাকার ছাপ না পড়লে শুরু হয় না বাঙালি নববর্ষ। বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীরা এই দিনটিকে হালখাতা হিসাবে পালন করেন। দোকানে নতুন খাতা আনা হয়। লক্ষ্মী ও গণেশের পুজো ভক্তিভরে করা হয়। ক্রেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টিমুখ করানো হয়। পুরানো হিসাব মিটিয়ে নতুন করে খাতা খোলার যে প্রথা, এখনও বহু ব্যবসায়ীর মনে ধরে আছে বড় যত্নে। এই প্রথা পালনের মধ্য দিয়ে দিনটি নতুন করে সম্পর্ক গড়ার দিনও। হিসাব মেটানোর পর বাংলার ঘরে ঘরে মিষ্টির প্যাকেট ও ক্যালেন্ডার নিয়ে বাড়ি ফেরা, এক অন্যকরম অনুভূতি। কাঁথি শহরের বস্ত্র বিপণি থেকে শুরু করে জুয়েলারি হাউস-সর্বত্র এখনো এই প্রথার উজ্জ্বল ছবি লক্ষ্য করা যায়। কাঁথি শহরের সুপার মার্কেট সহ পুরানো বাজারে ঘুরলে দেখা যায়, কিছু দোকানে এখনো ক্যালেন্ডারের গায়ে লাল রঙের ছাপ, হালখাতার গায়ে শাখা-সিঁদুর ও ধূপকাঠির গন্ধ মেশানো স্মৃতি। আধুনিক ডিজিটাল সিস্টেম চালু হলেও এই ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা অটুট রয়েছে। কাঁথির অনেক ব্যবসায়ীই নিয়ম মেনে হালখাতা পুজো করেন। আলাদারপুটের এক ব্যবসায়ী সারস্বত বাগ বলেন, এখন আমার দোকানে ডিজিটাল বিলিং হয়। সমস্ত হিসাব সফটওয়্যারের মাধ্যমে রাখা হয়। তবুও হালখাতা আমাদের কাছে ঐতিহ্য। এর ঐতিহ্য অস্বীকার করা যায় না। প্রতিবছর নতুন খাতা কিনি এবং পুজো করি। এটি বাঙালি সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এগরার এক কাপড়ের ব্যবসায়ী রঞ্জন দাস বলেন, আমি ২০ বছর ধরে ব্যবসা করছি, এখনও বৈশাখের প্রথম দিনে নতুন খাতা খুলি। যদিও হিসাব রাখি সফটওয়্যারে। শুভদিনে হালখাতা খোলাটা একটা রীতি। তাই চালিয়ে যাচ্ছি। লেখক ও প্রাবন্ধিক চৈতন্যময় নন্দ বলেন, ডিজিটাল ক্যালকুলেশন, জিএসটি বিল, অনলাইন পেমেন্ট, সবকিছু থাকলেও ‘হালখাতা’ এই একটি ছোটো প্রথার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে বাঙালির একটি বিশুদ্ধ আনন্দের অনুভূতি।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ