প্রয়াত যোগেন
  • ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: তিনি বলতেন, ‘শরীর এক জৈবিক বিস্ময়।’ তাই দেশভাগের ক্ষত, উদ্বাস্তু জীবনের ভাঙচুর ও শরীরে তাদের প্রভাব বারবার উঠে এসেছে তাঁর ইজেলে। গত ১৪ মাস ধরে ক্যানসার ও মূত্রনালির সংক্রমণের সঙ্গে লড়াই করার সময়ও ভোলেননি রং তুলির কাব্য। তিনি ভারতীয় চিত্রকলার অন্যতম ব্যক্তিত্ব যোগেন চৌধুরী। রবিবার ভোরে বাইপাস সংলগ্ন এক বেসরকারি হাসপাতালে প্রয়াত এই কিংবদন্তি শিল্পী। বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। মহাষষ্ঠীর দিন সকালে হাসপাতালে ভরতি হয়েছিলেন। শিল্পীর মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। লিখেছেন, ‘গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ওঁর অনেক সৃষ্টি অক্ষয়, অমর হয়ে রয়েছে। বিরাট বড়োমাপের শিল্পী।’ শোকজ্ঞাপন করেছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও।

Advertisement

১৯৩৯ সালে অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরের দহরপাড়া গ্রামে জন্ম যোগেন চৌধুরীর। বাবা প্রমথনাথ ছিলেন জমিদার। ছেলের শিল্পমনের পরিচয় সকলের আগে পান তাঁর মা। বাড়ির দেওয়ালে একটি ময়ূরের ছবি এঁকেছিল ছেলে। মাত্র আট বছর বয়সে কলকাতায় চলে আসতে হয় তাঁকে। পরবর্তী জীবন ছিল উদ্বাস্তুর। ভাগ্যের দুর্বিপাক হজম করতে হয়েছে বারবার। তবু সুযোগ পেলেই বিভিন্ন পত্রিকা থেকে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শাহজাহানের মৃত্যুশয্যায়’ বা পাবলো পিকাসোর ‘শ্বেতকপোত’-এর মতো ছবি নিজের সংগ্রহে এনেছেন। 
১৯৬০ সালে কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজ থেকে পাশ করেন তিনি। তারপর হাওড়া জেলা স্কুলে অঙ্কন শিক্ষক। ১৯৬২ সালে কলকাতার হ্যান্ডলুম বোর্ডে ডিজাইনার হিসাবে যোগ দেন। এরপর চলে যান প্যারিসে। সেখানে অঙ্কনশিল্পে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। রেখাজালের অদ্ভুত কাজ ও আঁকিবুকি মন দিয়ে শিখেছিলেন ইউরোপে বসে। তার উপর ছিল নিজের উদ্বাস্তু জীবন ও বাংলাদেশে ফেলে আসা শিকড়ের শোক। প্যারিস থেকে ফিরে শিল্পচর্চা ও নিজের ঘরানাকে প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেন। সামাজিক ছবি থেকে রাজনৈতিক কার্টুন সবেতেই ছিলেন সিদ্ধহস্ত। প্যারিসে থাকাকালীন পারিবারিক দায়িত্ব নিতে একবার চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে চাকরি ছেড়ে সম্পূর্ণ শিল্পচর্চায় মনোনিবেশ করেন। 
১৯৭২ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ভবনের কিউরেটর ছিলেন যোগেন চৌধুরী। শান্তিনিকেতন কলাভবনের অধ্যাপক ও প্রধান হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। পদ্মভূষণ, ললিতকলা অ্যাকাডেমি, ফ্রান্সের প্রিক্স দে লা জঁ পেন্তুর সবই ছিল সম্মানের ঝুলিতে। ২০১৪ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদও হয়েছিলেন শিল্পী। কিন্তু কোনোদিন রাজনীতি তাঁর শিল্পের চেয়ে বড়ো হয়ে ওঠেনি। পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য কলকাতায় তৈরি করেছিলেন ‘চারুবাসনা দ্য যোগেন চৌধুরী সেন্টার ফর আর্টস’। তাঁর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ শিল্পমহল। ভারতের আধুনিক শিল্পকলার মাইলফলক হয়ে থেকে যাবে তাঁর অবদান। রেখাজালে আঁকা জনজীবন দিয়েই তিনি আচ্ছন্ন করে রাখলেন শিল্পের মায়াকানন।