Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ছিদ্রান্বেষীর বিড়ম্বনা

হাজার হাজার চাকরি বাতিলের রূপকার তিনিই। কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে তাঁর দেওয়া এক বিতর্কিত রায়েই বাংলার ২৬ হাজার স্কুল শিক্ষক-শিক্ষিকার চাকরি রাতারাতি নাকচ হয়ে যায়।

ছিদ্রান্বেষীর বিড়ম্বনা
  • ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হাজার হাজার চাকরি বাতিলের রূপকার তিনিই। কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে তাঁর দেওয়া এক বিতর্কিত রায়েই বাংলার ২৬ হাজার স্কুল শিক্ষক-শিক্ষিকার চাকরি রাতারাতি নাকচ হয়ে যায়। উচ্চ আদালতের পবিত্র আসন থেকে শুধু রায় ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হননি তিনি, রীতিমতো হুংকারও দিয়েছিলেন ‘ঢাকিসহ বিসর্জন’ দেওয়ার! তাঁর ওই অবাঞ্ছিত মন্তব্যের নিশানা কে ছিলেন, বিচারপতি তাঁর নাম না নিলেও ব্যাপারটি বাস্তবিক ঊহ্য ছিল না। মন্তব্যটি কতখানি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল তাও খোলসা হয়ে গিয়েছিল অতিদ্রুত। 

Advertisement

এই ‘মহামান্যবর’ ব্যক্তিটি হলেন আদি ও অকৃত্রিম অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। মাত্র দেড় বছর আগেও তিনি হাইকোর্টে বিচারপতির আসন অলংকৃত করেছেন। বর্তমানে তিনি বিজেপি সাংসদ—মোদি-শাহের ‘পার্টি উইথ আ ডিফারেন্সের’ লোকসভার সদস্য। অবসরগ্রহণের পর বিচারপতিদের অবস্থান কী হওয়া উচিত, সংগত প্রশ্নটি যখন দেশজুড়ে চর্চার কেন্দ্রে ঠিক সেইসময় অভিজিৎবাবু বিচারপতির আসন থেকে নেমেই সরাসরি কেন্দ্রের শাসক দলের ছাতার নীচে আশ্রয় নেন। গডসে-সাভারকারের অনুগামীদের দলের পতাকা হাতে তাঁকে প্রকাশ্যে হাসতেও দেখা গিয়েছে। প্রাক্তন বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায় ২০২৪ সালের ৫ মার্চ হাইকোর্ট থেকে অবসরগ্রহণের দু’দিন পরই বিজেপির সদস্যপদ নেন। অতঃপর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন সাধারণ নির্বাচনে। এই মামলা এবং রায়ের ফায়দাও তিনি তুলেছিলেন ভোটযন্ত্রে। এমনকী নির্বাচনী প্রচারে বেরিয়ে সে-বছর ১৫ মে বাংলার জননেত্রী, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে কুরুচিকর মন্তব্য করে নয়া বিতর্কেও জড়িয়ে পড়েন তিনি। তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ খতিয়ে দেখে জাতীয় নির্বাচন কমিশন অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়কে ‘সেন্সরও’ করেছিল। নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় শিক্ষকদের মধ্যে কারা ‘যোগ্য’ এবং কারা ‘অযোগ্য’—এই প্রশ্ন, এই ধন্দ ছিল গোড়া থেকেই। আশ্চর্য ‘সমাধান’ অবশ্য এই ‘মহামান্য’ বিচারপতিই বাতলে দিয়েছিলেন—‘অযোগ্যদের’ খুঁজে না-পাওয়া গেলে গোটা প্যানেলই খারিজ হয়ে যাবে! বিচারপতির উচ্চাসনে বসেই সেই ভয়ংকর পথ দেখিয়েছিলেন তিনি। 
নীতি-নৈতিকতার বড়াই করা একমাত্র তাঁরই সাজে, যিনি আক্ষরিক অর্থেই অগ্নিশুদ্ধ। অর্থাৎ মানুষটি হবেন সর্বাংশে সর্বার্থে নির্লোভ, হাজার চেষ্টাতেও যাঁকে দুর্নীতির পাঁকে টেনে এনে ফেলা অসম্ভব, বহু চেষ্টাতেও যাঁর চরিত্রে কালি ছিটানো যায় না। কিন্তু ‘দাগি’ শিক্ষক-শিক্ষিকার তালিকা প্রকাশ পেতেই যে অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের স্বনির্মিত উচ্চ মিনার হালকা হাওয়াতেই চুর চুর হয়ে ঝরে পড়ে গেল! এ কী দেখছি আমরা? অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়েরই নির্বাচনী এজেন্ট দীপক দেবশর্মার স্ত্রী শ্রাবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি ‘দাগি’! অন্তত এসএসসির তালিকা সে-কথাই বলছে। হয় টাকার জোরে অথবা প্রভাব খাটিয়ে তিনিও শিক্ষক হয়েছিলেন। প্রবেশ করেছিলেন ওই ২৬ হাজারি প্যানেলে। পটাশপুরের নেকুরসিনি বিবেকানন্দ বিদ্যাভবনের ইতিহাস শিক্ষিকা ছিলেন তিনি। ‘অযোগ্য’ শিক্ষিকা হিসেবে স্কুলে যাওয়াও বন্ধ ছিল তাঁর। শনিবার এসএসসির প্রকাশিত ১৮০৬ জন ‘অযোগ্য’ শিক্ষক-শিক্ষিকার তালিকায় শ্রাবন্তী দেবীর নাম থাকায় সেই ‘সত্যেই’ পড়ল সিলমোহর। উল্লেখ্য, শ্রাবন্তী দেবীর স্বামী দীপকবাবু বিজেপির মণ্ডল কমিটির সহসভাপতি ছিলেন। পাশাপাশি ২০২৪ সালে লোকসভা ভোটের সময় শহিদ মাতঙ্গিনী ব্লকের বল্লুক-১ অঞ্চলের নির্বাচনী কমিটির আহ্বায়কও ছিলেন তিনি। সেই সুবাদে তিনি ওই এলাকায় প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের নির্বাচনী এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। শিক্ষক নিয়োগ মামলায় সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন অভিজিৎবাবু। ১৮০৬ জন ‘অযোগ্য’ প্রার্থীর জন্য হাজার হাজার ‘যোগ্যকেও’ চাকরিহারা করার পথ সুগম করেছিলেন তিনি। অভিজিৎবাবু বিচারপতির পদ থেকে অবসর নিয়েছেন এবং পদ্ম প্রতীকে ভোটে দাঁড়িয়ে এমপি হিসেবে পা রেখেছেন পার্লামেন্টে। আর তাঁরই নির্বাচনী এজেন্টের স্ত্রী কিনা শেষমেশ ‘দাগি’! এ যে, সুচের ছিদ্রান্বেষণ করছে চালনি! এই ঘটনায় প্রাক্তন বিচারপতির বিড়ম্বনার খবর জানতে আগ্রহী নিশ্চয় সারা দেশ। তবে আপাতত, শ্রাবন্তী দেবীর বাড়ির অবস্থাটি চাকরিহারা হাজার হাজার পরিবারের মতোই করুণ। দেবশর্মা পরিবার অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের বাগাড়ম্বরের প্রায়শ্চিত্ত করছে না কি?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ