Bartaman Logo
২৪ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

অনুব্রত ঘনিষ্ঠ চালকল মালিকের অপকীর্তি, রেশনে নিম্নমানের চাল বণ্টন, নেপথ্যে রাজীবের সিন্ডিকেট!

বীরভূমের আহমদপুর অঞ্চল তৃণমূলের সভাপতি রাজীব ভট্টাচার্য ও তাঁর সহযোগী চন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হতেই এখন জেলাজুড়ে চর্চায় তাঁদের দুর্নীতির কাহিনী।

অনুব্রত ঘনিষ্ঠ চালকল মালিকের অপকীর্তি, রেশনে নিম্নমানের চাল বণ্টন, নেপথ্যে রাজীবের সিন্ডিকেট!
  • ১৮ মে, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: বীরভূমের আহমদপুর অঞ্চল তৃণমূলের সভাপতি রাজীব ভট্টাচার্য ও তাঁর সহযোগী চন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হতেই এখন জেলাজুড়ে চর্চায় তাঁদের দুর্নীতির কাহিনী। সাঁইথিয়া ও পাড়া থানায় কয়েক কোটি টাকার সরকারি চাল চুরির মামলা করেছে খাদ্যদপ্তর। এর গভীরে উঁকি দিতেই বেরিয়ে আসছে সাধারণ মানুষের পেটে লাথি মেরে কোটি কোটি টাকা কামানোর এক চক্রব্যূহ। অভিযোগ, চালকল মালিক রাজীব কেবল চাল আত্মসাতই করেননি, বরং রেশনে নিম্নমানের চাল পাঠানোর এক অঘোষিত ‘সার্কুলার সিস্টেম’ তৈরি করেছিলেন। পুলিশের এক কর্তা বলেন, তদন্ত চলছে। 

Advertisement

পুলিশি তদন্তে উঠে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। নিয়ম অনুযায়ী, সরকার চাষিদের থেকে উন্নতমানের ধান কিনে মিলে পাঠাত। কিন্তু অভিযোগ, সেই ভালো ধানের চাল খোলা বাজারে চড়া দামে বিক্রি করে দেওয়া হত। আর বিনিময়ে রেশনের জন্য বরাদ্দ সরকারি বস্তায় মেশানো হত খুদ, কাঁকর আর ভাঙা চাল। যাঁদের উপায় ছিল না, তাঁরা এই চাল নিতেন। নিম্নমানের এই চাল দেখে অনেক সাধারণ মানুষ রেশন নিতেন না। আশ্চর্যজনকভাবে, সেই চাল ডিলারদের হাত ঘুরে ফের ফিরে আসত রাজীবের মিলে। এরপর নতুন মোড়কে সেই একই চাল ফের রেশনে পাঠানো হত। 
শুধু তাই নয়, জেলায় একসময় এমন লক্ষাধিক রেশন কার্ড ছিল যার বাস্তবে কোনও অস্তিত্বই নেই। হয় উপভোক্তা মারা গিয়েছেন, অথবা তিনি এলাকা ছেড়েছেন, কিংবা সম্পূর্ণ কাল্পনিক নাম-পরিচয় দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এই কার্ডগুলি। নিয়ম অনুযায়ী, এই কার্ডগুলির বিপরীতে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ চাল বরাদ্দ হত। খাতায়-কলমে দেখানো হত সাধারণ মানুষ রেশন সংগ্রহ করেছেন, কিন্তু আদতে সেই চালের বস্তা সরকারি থেকে ফের ফিরে আসত মিলে। ফের সেই চাল নতুন বস্তায় ভরে পাঠিয়ে দেওয়া হত সরকারের কাছে। পরবর্তীতে ই-পস মেশিন এবং আধার কার্ডের সঙ্গে রেশন কার্ডের সংযুক্তিকরণ বাধ্যতামূলক হওয়ায় এই ভুয়ো সাম্রাজ্যে অনেকটাই টান পড়ে।
এই বিপুল দুর্নীতি স্রেফ একার ক্ষমতায় করা সম্ভব ছিল না। অভিযোগ, খাদ্য দপ্তরের এক শ্রেণির আধিকারিকদের সঙ্গে রাজীবের ছিল ‘গলায় গলায় ‘পিরিত’। মিলে চালের মান যাচাই করতে আসা কর্মীদের থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্তাদের সঙ্গেও চলত গোপন ‘সেটিং’। এমনকি জেলার সিংহভাগ ধান ক্রয় কেন্দ্র বা সিপিসি রাজীবেরই নিয়ন্ত্রণে ছিল। কৃষকদের অ্যাকাউন্ট ‘ভাড়া’ নিয়ে ধান কেনা থেকে শুরু করে ধানে অতিরিক্ত ‘বাটা’ নেওয়া-সবটাই নিয়ন্ত্রিত হত তাঁর অঙ্গুলিহেলনে।
রাজীবের এই উত্থান অত্যন্ত নাটকীয়। একসময় যে চালকলে তিনি সামান্য কর্মীর কাজ করতেন, সেখানে আর্থিক নয়ছয়ের দায়ে কাজ খোয়াতে হয়েছিল তাঁকে। এরপর পুরন্দরপুর জোনাল কো-অপারেটিভে গম চুরির কেলেঙ্কারিতেও তাঁর নাম জড়ায়। কিন্তু অভিযোগ, বীরভূমের দাপুটে নেতার স্নেহের হাত মাথায় পড়তেই তাঁর ভাগ্য ঘুরে যায়। রাতারাতি একের পর এক মিলের মালিক হয়ে ওঠেন তিনি। এমনকি যে মিল থেকে তাঁকে একদা বিতাড়িত করা হয়েছিল, সেই মিলটিও কিনে নেন রাজীব। কিন্তু ক্ষমতার দম্ভে এতদিন যা চাপা পড়েছিল, নবান্নে জমানা বদলাতেই সেই ‘ভুয়ো’ সাম্রাজ্যের কঙ্কাল এখন একে একে বেরিয়ে আসছে। এব্যাপারে রাজীবের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগ হয়েছে। তদন্ত চলছে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ