নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ভোরবেলাতেই সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ে দাঁড়িয়ে শয়ে শয়ে মানুষ। যাঁরা এ ছবি কোনোদিন দেখেননি তাঁরা দেখে চমকে যেতে পারেন। খানিক্ষণ দাঁড়ালে বোঝা যায়, ঠাকুরের পুজো শেষ হয়েছে। এবার ভোগ বিতরণ হবে। কেউ নিরাশ হবেন না, প্রত্যেকেই পাবেন। সেই স্বর্গীয় প্রসাদের আকাঙ্খায় কাকভোরেও রাজপথ লোকে লোকারণ্য। লেক কালীবাড়ির এ ভোগ মাহাত্ম্য বছরের পর বছর ধরে অমলিন।
মন্দিরের সেবায়েত নিতাইচন্দ্র বসু। মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তন্ত্রসাধক হরিপদ চক্রবর্তী। তিনিই নিতাইবাবুকে একমাত্র সেবায়েত হিসাবে দায়িত্বভার অর্পণ করে গিয়েছিলেন। এবছর কালীপুজোর আগে নিতাইবাবু মন্দির তৈরির কাহিনি শোনালেন। ১৯৪৯ সালের ১৩ই এপ্রিল গুরুদেব হরিপদ চক্রবর্তী শ্রীশ্রী ১০৮ করুণাময়ী কালীমাতা মন্দির (লেক কালীবাড়ি) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি ছিলেন তন্ত্রসাধক। এখানে তখন একটি ছোট মন্দির ছিল। সেখানে প্রতিবছর কালীপুজো করতেন মাটির মূর্তিতে। তারপর প্রতিমা বিসর্জন হত। একদিন কালী স্বপ্নাদেশে তাঁকে মূর্তি প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। গুরুদেব আচমকা জেগে উঠে চমকে দেখেন, মা স্বয়ং সামনে দাঁড়িয়ে। গুরুদেব বলেন, মা আমার ক্ষমতা সীমিত। আমি তোমার পুজো কিভাবে করব? কালী তখন বলেছিলেন, ফুল-বাতাসা দিয়ে পুজো করলেই হবে। এরপর ১৯৪৯ সালে গুরুদেবের শিষ্য আশীষ সেনগুপ্ত মূর্তি গড়েন। নিত্যপুজো আরম্ভ হয়। ১৯৭৩ সালে কালীর কষ্টিপাথরের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। সে মূর্তিই আজও বর্তমান।
এরপর খড়ের চালের ছোটো মন্দির পরে ইটের দেওয়াল, টিনের চাল, তারপর অ্যাসবেস্টসের চাল হয়েছে। যা আজও আছে। তবে গুরুদেবের স্বপ্ন ছিল পাথরের মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত থাকবেন মা। এ কথা বহু শিষ্য জানতেন। এরপর সাদা শ্বেতপাথরের মন্দির তৈরি হয়। এ মন্দির তৈরি শুরু ২০০২ সালে। ধীরে তা তৈরি হচ্ছে। এটির আর্কিটেক্ট অচ্যুত কানভিন্দে। দিল্লির বাসিন্দা। টেম্পল আর্কিটেক্ট হিসাবে রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত। উনিই এই মন্দিরের নকশা তৈরি করেন। মায়ের অসংখ্য ভক্তের দানের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে মন্দির।
নিতাইবাবু জানান, পুজোয় গঙ্গাজল ও তুলসিপাতা ব্যবহার হয় না। দু’বেলা ভোগ হয়। খিচুড়ি পোলাও ও পায়েস খুবই প্রসিদ্ধ। প্রতিদিন শয়ে শয়ে মানুষ সান্ধ্য ভোগের প্রসাদ নেন। কালীপুজো শেষে ভোরবেলাতেও ভোগের জন্য লাইন পরে। ভক্তদের ধারণা, লেক কালীবাড়িতে এলে সমস্যা সমাধানের রাস্তা বলে দেবী। মনস্কামনা পূর্ণ হলে বহু মানুষ পুজো দেন। ছাত্র-ছাত্রীরা পরীক্ষার আগে মায়ের পায়ে পেন-পেন্সিল ঠেকিয়ে আশীর্বাদী বেলপাতা নিয়ে পরীক্ষা দিতে যায়। ফলপ্রকাশের পর পুজো দেওয়ার হিড়িক পড়ে। করুণাময়ীর নাম শুধু বাংলায় নয়, গোটা ভারতে ও বিদেশেও ছড়িয়ে আছে। মানুষের বিশ্বাস, কোনো বিপদে পড়লে মা’কে স্মরণ করে সাধ্যমত প্রার্থনা করলে বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। নিজস্ব চিত্র



