Bartaman Logo
৪ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কাটছে চার বছরের খরা

পশ্চিমবঙ্গে মনরেগা প্রকল্পের খরা কাটতে চলেছে। নতুন প্রকল্পে ১২৫ দিনের কাজের নিশ্চয়তা। গরিবদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিস্তারিত পড়ুন।

কাটছে চার বছরের খরা
  • ৪ জুন, ২০২৬ ০৪:০০

পশ্চিমবঙ্গে ১০০ দিনের কাজ (মনরেগা) বন্ধ হয়েছে ২০২২ সালে। তার আগে পর্যন্ত এই খাতে কেন্দ্রের কাছে বাংলার হকের পাওনা আটকে ছিল ৬,৯১৯ কোটি টাকা। স্বাভাবিক নিয়মে তারপরে বাংলার জন্য লেবার বাজেট বরাদ্দ হলে রাজ্য আরো ৫০,৩৪৪ কোটি টাকা পেত। কিন্তু রাজ্যকে সেই বিপুল পরিমাণ অর্থ দেওয়া হয়নি বলে ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ জানিয়েছিল পূর্বতন তৃণমূল কংগ্রেস সরকার। ওই টাকা রাজ্যে আসার মানে ছিল, বাংলার গরিব মানুষগুলি হাতে হাতে কাজের ব্যবস্থা। মহাত্মা গান্ধীর নামাঙ্কিত এই কর্মনিশ্চয়তা প্রকল্প কংগ্রেস জমানায় চালু করার উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত মহৎ। ভারতের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা বৈষম্য ও বেকারত্ব। তার প্রধান বলি গরিব মানুষ। এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি গ্রাম ভারতে। তাই এমন একটি আইন তৈরি করা হয়েছিল যে, গ্রামের যেকোনো মানুষ দাবি করামাত্র সরকার তাঁকে বছরে অন্তত ১০০ দিনের কাজ দিতে বাধ্য থাকবে। গত দুই দশকে ভারতে দারিদ্র অবশই কিছুটা কমেছে। তার পিছনে মনরেগা প্রকল্প রূপায়ণের কৃতিত্ব যে বিরাট, তাতে সন্দেহ কী? বলা বাহুল্য, মনমোহন সিংয়ের দুটি ইউপিএ জমানাতেই মনরেগা রূপায়ণে বেশ গতি ছিল। 

Advertisement

জনমুখী প্রকল্পটির বারোটা বাজানো হয়েছে মোদিযুগে। যখন কাজের দিন বৃদ্ধির দাবি জোরালো হচ্ছে, তখনই এই খাতে কেন্দ্রীয় বরাদ্দ ছেঁটে দেওয়া হয়। তারই মধ্যে চলেছে ‘সিঙ্গল ইঞ্জিন’ সরকারগুলির সঙ্গে চরম বঞ্চনার খেলা। অবিজেপি রাজ্য সরকারগুলির মধ্যে মোদিবাবুদের সবচেয়ে অপছন্দের ছিল বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। যদিও মোদির সরকার এবং পার্টির অভিযোগ ছিল, মনরেগা প্রকল্প রূপায়ণের নামে তৃণমূল সরকার ঢালাও অনিয়ম, বেনিয়ম, দুর্নীতি করেছে। কেন্দ্রীয় সরকার নানাভাবে জবাব চেয়েও নবান্নের কাছে সদুত্তর পায়নি। যাই হোক, মনরেগাসহ একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্প নিয়ে একদশকের বেশিকাল যাবৎ দিল্লি-নবান্ন আকচাআকচি চলেছে। এই তরজায় কারো কারো রাজনৈতিক ফায়দা অবশ্যই হয়েছে। কিন্তু দিনের শেষে সর্বনাশ হয়েছে শুধু লক্ষ লক্ষ গরিব পরিবারের। তারা সবাই বাংলার মানুষ। এই সর্বনাশের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে গ্রামবাংলার অর্থনীতিতেও।
রাজ্যে নতুন সরকার, প্রথম ডবল ইঞ্জিন সরকার তৈরি হতেই টানা চার বছরের সেই খরা কাটতে চলেছে।  চলতি সপ্তাহেই পশ্চিমবঙ্গে শুরু হচ্ছে ‘মনরেগা’ প্রকল্পের কাজ। তবে নতুন নামে, নব প্রকরণে। মহাত্মা গান্ধীর নামাঙ্কিত প্রকল্পটিতে ছিল বছরে ১০০ দিনের কাজের গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা। নতুন প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে বিকশিত ভারত গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ), সংক্ষেপে ভিবি জি রাম জি। এই নয়া নামের প্রকল্পে বছরে ন্যূনতম ১২৫ দিনের কাজের নিশ্চয়তা থাকছে। তাই এটি ১২৫ দিনের কাজের প্রকল্প হিসাবে পরিচিতি পাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের জন্য ১ কোটি ৪০ লক্ষ থেকে দেড় কোটি শ্রমদিবস মঞ্জুর করতে চলেছে কেন্দ্র। মনরেগার পরিবর্তে ‘ভিবি জি রাম জি’ পশ্চিমবঙ্গসহ গোটা দেশে শুরু হবে আগামী ১ জুলাই থেকে। তার আগেই প্রায় একমাস এরাজ্যের জবকার্ডধারীদের হাতে কাজ দিতে দু-একদিনের মধ্যেই ‘মনরেগা’ প্রকল্পের আওতায় শ্রমদিবস বরাদ্দ করতে চলেছে নয়াদিল্লি। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে ২০২২ সালের মার্চ মাস থেকে বাংলায় ১০০ দিনের কাজে অর্থবরাদ্দ বন্ধ করে দেয় কেন্দ্র। তারপর থেকে প্রতিটি অর্থবর্ষে রাজ্য নিয়ম মেনে শ্রমদিবস সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠালেও কেন্দ্রের অনুমোদন মেলেনি। গতবছর সুপ্রিম কোর্ট এবং কলকাতা হাইকোর্ট বাংলায় অবিলম্বে ‘মনরেগা’ প্রকল্প চালু করার নির্দেশ দেয় কেন্দ্রকে। তার প্রেক্ষিতে গত ডিসেম্বরের গোড়ায় কাজ শুরুর জন্য একগুচ্ছ শর্ত বেঁধে দিয়ে চিঠি পাঠায় মোদি সরকার। তবে সেই শর্তগুলি মানতে রাজি হয়নি পূর্বতন সরকার। রাজ্যে পালাবদলের পর স্বাভাবিকভাবেই সেই শর্তাদি মেনে নেওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মে মাসের শেষে ‘মনরেগা’ সংক্রান্ত এগজিকিউটিভ কমিটির বৈঠক ডাকে কেন্দ্র। সেখানে যোগ দেন পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত দপ্তরের পদস্থ কর্তারাও। পশ্চিমবঙ্গে কাজ শুরুর জন্য কেন্দ্র সবুজ সংকেত দেয় ওই বৈঠকেই। কাজ শুরু করার আগে শ্রমদিবস বরাদ্দ করতে হয় দিল্লিকে। সেইমতো আগামী একমাসের জন্য প্রায় দেড় কোটি শ্রমদিবসের অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র। এখন কেবল এই সংক্রান্ত অনুমোদনের চিঠি বা নির্দেশিকা আসার অপেক্ষা। আগামী দু-একদিনের মধ্যেই সেই চিঠি রাজ্যের হাতে এসে পৌঁছাবে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্ট মহল। অফিসারদের ট্রেনিং সম্পন্ন করে রাজ্যও তার জন্য তৈরি। আশা করা যায়, নির্দিষ্ট দিনেই এই কাজ শুরু হবে এবং চলবে যথানিয়মে। এবার সদিচ্ছা ও স্বচ্ছতার কোনো অভাব দেখতে চায় না বাংলা। কারণ ইতিমধ্যেই গরিব মানুষের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গিয়েছে।

সম্পর্কিত সংবাদ