মৃণালকান্তি দাস: অজানা প্রাণী আবিষ্কার কঠিন কাজ নয়। লাতিন আমেরিকার বনবাদাড়ে একটা গোটা দিন কাটিয়ে আসুন। বনে বসে বসে মরা গাছের গুঁড়ি ওলটান। গাছের বাকলের ফাঁকে চোখ রাখুন, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাতার স্তূপ সরিয়ে দিন অথবা রাতে সাদা কাপড়ের উপর মার্কারি আলো ছড়িয়ে দিন। দেখবেন সর্বত্র রয়েছে নানা ধরনের বিচিত্র ছোটো ছোটো প্রাণী। আপনার সংগ্রহে মথ, শুককীট, মাকড়সা, ছারপোকা, জ্বলজ্বলে কাচপোকা, গুবরে পোকা, বোলতার আকৃতির নিরীহ প্রজাপতি, পিঁপড়ে, লাঠি বা পাতার মতো পোকায় ভরে উঠবে। লাঠির মতো পোকা দেখে আপনি হয়তো বুঝতেই পারবেন না যে এটি একটি জীব। মনে হবে যেন গাছের কাঁটা। কাছে যেতেই কাঁটাটি চলতে শুরু করে। সুন্দর পাতা মনে করে যেই না হাত বাড়ান অমনি ফুড়ুৎ! পাখা দুলিয়ে উড়ে যায় প্রজাপতি। জীবজগতের এই বৈচিত্র দেখে গোটা দিন আপনার বিস্ময়ের ঘোর কাটবে না। আপনার সংগ্রহ করা এসব প্রাণীর মধ্যে নিশ্চিতভাবেই এমন কোনো একটি থাকতে পারে, যার বর্ণনা এখনও পর্যন্ত বিজ্ঞানে নেই...। —লেখকের নাম ডেভিড অ্যাটেনবরো। বইয়ের নাম ‘দ্য অরিজিন অব লাইফ অন আর্থ’।
শতবর্ষে পা রেখেও মানুষটি এখনও বিজ্ঞানের জ্ঞানভাণ্ডার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সাঁকো তৈরি করে চলেছেন। তাঁর প্রথম জীবনে করা ‘লাইফ অন আর্থ’ সিরিজ শুধুমাত্র এক বিস্ময়-জাগানো ফিল্ম নয়। মানুষের মনে গেঁথে যাওয়া এক অনুভব! ১৯২৬ সালে জন্ম নেওয়া এই প্রকৃতিবিদের ১০০ বছরের জীবন যেন নিজেই এক জীবন্ত মহাকাব্য। রেডিও ও টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর চেয়ে দীর্ঘ ক্যারিয়ার আর কারও আছে কি না, জানা নেই। তিনি এমন এক ম্যাটিনি শোয়ের নায়ক, যাতে তিনি একাই হিরো। ‘প্ল্যানেট আর্থ’ সিরিজে তাঁর সহ-অভিনেতা গোটা পৃথিবী। এই সিনেমায় একমাত্র খলনায়ক পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা মানুষ!
এই দুনিয়ায় যারা জলবায়ু পরিবর্তন বা প্রকৃতির বিপর্যয় দেখে হতাশায় ভুগছেন, তাদের জন্য তাঁর পরামর্শ, ‘এখনও সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। প্রকৃতি হল মানুষের সবচেয়ে বড়ো এবং বিশ্বস্ত মিত্র। আমরা যদি তাকে একটু সুযোগ দিই, সে ঠিকই অলৌকিক উপায়ে নিজেকে সারিয়ে তোলে। প্রকৃতি জানে কীভাবে ক্ষতবিক্ষত বুক নিয়ে আবারও জেগে উঠতে হয়। আমাদের শুধু সেই সময়টুকু দিতে হবে। যেখানেই আমরা প্রকৃতিকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছি, প্রকৃতি সেখানেই নিজের রূপ ফিরে পেয়েছে। আর সেই পুনরুদ্ধারের সুফল হিসাবে আমাদের নিজেদের জীবনও হয়ে উঠেছে আরও উন্নত ও সমৃদ্ধ।’ অ্যাটেনবরো বলেছিলেন, ‘পৃথিবী রসাতলে যাচ্ছিল আমি জানতাম, তবুও কিছু করিনি— এ কথা কীভাবে নাতি-নাতনিদের দিকে তাকিয়ে বলব?’
একটা শতাব্দী ধরে তিনি চষে বেড়িয়েছেন বন-পাহাড় আর মহাসমুদ্র। সময় কাটিয়েছেন গরিলা পরিবারের সঙ্গে। কুড়িয়েছেন প্রাচীন জীবাশ্ম। আর খুঁজে বের করেছেন লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা আদিম সব উপজাতি। ইউরোপে রঙিন টেলিভিশন সম্প্রচারের সূচনা থেকে শুরু করে কোটি কোটি দর্শককে প্রকৃতির রহস্য শোনানো— সবই করেছেন এই এক জীবনে। ডজন ডজন প্রাণীর নামকরণ হয়েছে তাঁর নামে, আর জীবনের শেষলগ্নে এসে তিনি হয়ে উঠেছেন জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে পৃথিবীর সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠস্বর। মানুষের সঙ্গে, পশুপাখির সঙ্গে আর গাছপালার সঙ্গে কাটানো এই বর্ণিল জীবনের বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য রোমাঞ্চকর গল্প। তাঁর ট্রেডমার্ক স্নেহঝরা গলা বাদে বিবিসি–র ‘ক্লাসরুম’ তো অকল্পনীয়। ওল্ড টেস্টামেন্টের রাজা ডেভিডের মতোই তাঁর কণ্ঠ শুনে নমিত হয়ে আসে পৃথিবীর যেকোনো প্রাণ।
তিনি পৃথিবী নামক ব্র্যান্ডের একমাত্র অ্যাম্বাসেডর। সব প্রাণীর ভাষাই সম্ভবত জানেন ডেভিড। অথবা ডেভিডের ভাষাই প্রাণিজগতের লিংগুয়া ফ্রাংকা। একটি তিমি একটি পেঙ্গুইনের সঙ্গে যে ভাষায় কথা বলে, সে ভাষার নাম ডেভিড। প্রাণী জগতের যে পৃথিবীব্যাপী অদৃশ্য ডাক বিভাগ, ডেভিড তার পোস্টমাস্টার জেনারেল। উত্তর মেরুর একটি সিন্ধুঘোটক কিংবা একটা বল্গাহরিণ দক্ষিণ মেরুর একটি সিল বা নীল তিমিকে চিঠি লিখে চলেছে প্রতিদিন। এ রকম লক্ষ লক্ষ চিঠি অ্যাটেনবরো ঠিকানা খুঁজে খুঁজে পৌঁছে দিচ্ছেন গত পঁচাত্তর বছর ধরে।
ডেভিড জাতে ব্রিটিশ। টেস্ট খেলা ওদের মজ্জায়, নার্ভাস নাইনটিজের বালাই সেখানে কম। পৃথিবী তার সব থেকে প্রিয় সন্তানকে সবুজ ও জানা-অজানা প্রাণের মাঝে আগলে রেখেছে বছরের পর বছর। সেঞ্চুরি পেরিয়েছেন ডেভিড অ্যাটেনবরো। এবছরই। এই তো সেদিন পুরানো ব্রিটিশ কেতায় ঢোলা স্যুট ও বেঢপ টাই পরে রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ইংল্যান্ডের রাজার সম্মানিত ‘স্যার’। রাজা চিঠি পাঠিয়েছেন নিজের হাতে... ‘আমার সৌভাগ্য তোমার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। বোধহয় সেই ১৯৫৮ সালে আমাদের প্রথম দেখা। কত দশক পেরিয়ে গিয়েছে ডেভিড, রঙিন টেলিভিশন তখনও আসেনি...।’ রাজার অনুরোধ ও আয়োজনেই রাজকীয় দরবারে বিশাল অর্কেস্ট্রায় স্বাগত জানানো হয়েছিল স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরোকে। দায়িত্বে বিখ্যাত ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যাল মিউজিক কন্ডাক্টর জেরেমি কুন। বেহালা, ভিয়োলা, চেলো, ক্ল্যারিনেট, ট্রমবোন, ট্রামপেট, সিম্বাল ও নানা বাদ্যযন্ত্রের পাশাপাশি সারাদিনের ওই কনসার্ট অর্কেস্ট্রায় মেশানো হয়েছিল রেসার স্নেকের হিসহিস, গভীর সমুদ্রে ওর্কা তিমির ডিগবাজি খাওয়ার শব্দ–সহ বিভিন্ন পশুপাখির ডাক। শতবর্ষী বৃক্ষ, অথচ চোখে তখন যেন সদ্য ঋজু হওয়া গুল্মের কৌতূহল। এই তো আমাদের টিনের চাল পেরিয়ে যে উঁকি দিতে চাইছে, পাড়া, মহল্লা, নদী, সমুদ্র পেরিয়ে গোটা দুনিয়া...! রাজাদের নিয়ে ডেভিডকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, টেলিফোন তুলে পৃথিবীর কর্তাদের সঙ্গে যদি কথা বলেন, আপনি কী বলবেন? ডেভিড বলেন, আমরা আত্মমগ্ন হয়ে আছি। এবার আমাদের কাজ সবাই মিলে এগোনো। নইলে স্বার্থপরতাই আমাদের ডোবাবে। ডোবাবেই...
১৯৭১ সালে শ্বাসরুদ্ধ অভিযানে নিউ গিনির এক জনমানবহীন দুর্গম এলাকায় ‘বিয়ামি’ উপজাতির সঙ্গে প্রথম দেখা করেছিলেন অ্যাটেনবরো। বিবিসির ‘এ ব্ল্যাঙ্ক অন দ্য ম্যাপ’ প্রামাণ্যচিত্রের জন্য তিনি এক বিশাল রোমাঞ্চকর পথ পাড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছেছিলেন। বিয়ামি উপজাতির সেই মানুষরা এর আগে কখনো বাইরের পৃথিবীর বা আধুনিক সভ্যতার কোনো মানুষ দেখেনি। এমনকি তারা জানতই না, তাদের পাহাড়ের ওপাশে অন্য কোনো জগৎ আছে।
কোনো সাধারণ ভাষা না জানলেও কেবল হাতের ইশারায় আর চোখের ভাষায় অ্যাটেনবরো তাদের সঙ্গে ভাব জমিয়েছিলেন। তাদের শরীরের অদ্ভুত সব গয়নাগাটি খুঁটিয়ে দেখা, তাদের জীবনযাত্রার ধরন বোঝা এবং নাকে পরা বিচিত্র কাঠি নিয়ে তাঁর সেই শিশুর মতো কৌতূহল আজও ক্যামেরার ফ্রেমে অমলিন। ২০১৬ সালে সিএনএনের ক্রিস্টিয়ান আমানপুরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সেই মুহূর্তটি স্মরণ করে বলেছিলেন, ‘আপনি যখন কারও ভাষার একটা শব্দও জানেন না, এমনকি তারা আগে কখনো আপনার মতো চামড়ার বা আপনার মতো পোশাকের কাউকে দেখেনি, তখনও আপনি তাদের সঙ্গে কতটা স্বচ্ছন্দ আর সাবলীল হয়ে উঠতে পারেন, তা অভাবনীয়।’ তিনি বিশ্ববাসীকে শিখিয়েছেন, হৃদয়ের টান থাকলে শব্দের দেওয়াল কোনো বাধা হতে পারে না।
১৯৬৮ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত অ্যাটেনবরো বিবিসির টেলিভিশন প্রোগ্রাম ডিরেক্টর হিসাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু প্রশাসনিক চেয়ারে বসে ফাইলের পর ফাইল সই করার চেয়ে নিজের ক্যামেরা আর রেকর্ডার নিয়ে প্রকৃতির নির্জনতায় ছুটে যাওয়ার নেশা তাঁকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফিরত। তাই ১৯৭২ সালে সেই প্রভাবশালী পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে তিনি আবারও বেরিয়ে পড়েছিলেন ডকুমেন্টরি নির্মাণের নেশায়। তাঁর এই সাহসী সিদ্ধান্তের কারণেই বিশ্ববাসী পরবর্তী সময়ে পেয়েছে ‘লাইফ অন আর্থ’-এর মতো বিশ্বমানের ডকুমেন্টরি সিরিজ। প্রশাসনিক কাজের গণ্ডি আর ক্ষমতার মোহ তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি। কারণ, তাঁর আসল ঘর ছিল আদিম প্রকৃতি আর অবারিত অরণ্যের গভীরে।
১৯৭৮ সালে রুয়ান্ডার ভিরুঙ্গা পর্বতমালার মেঘে ঢাকা গভীর বনে এক মাউন্টেন গরিলা পরিবারের সঙ্গে তাঁর সখ্য তৈরি হয়। ‘লাইফ অন আর্থ’ চিত্রায়ণের সময় এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটে। ‘পাবলো’ নামে তিন বছরের এক শিশু গরিলা হুট করে অ্যাটেনবরোর গায়ের উপর এসে পড়ে এবং পরম নির্ভরতায় গড়াগড়ি খেতে শুরু করে। সেই দৃশ্যটি গোটা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছিল এবং বন্য প্রাণীদের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলে দিয়েছিল। সেই সত্তরের দশক থেকে শুরু করে আজ শতবর্ষে দাঁড়িয়েও গরিলার সঙ্গে তাঁর এই আত্মিক টান একবিন্দুও ম্লান হয়নি। তিনি মনে করেন, প্রাণীদের সঙ্গে মানুষের এই আদি সংযোগই আমাদের শেখায় যে আমরা সবাই একই প্রকৃতির অংশ।
এভাবেই সাত দশক ধরে পৃথিবীর এক মেরু থেকে অন্য মেরুতে অক্লান্তভাবে ছুটে বেড়িয়েছেন তিনি। ক্যামেরার চোখে তুলে ধরেছেন এই ধরণির রূপ-রস আর অন্তহীন বৈচিত্রের এক মায়াবী জগৎ। একশো বছর পূর্ণ করে স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো কেবল একজন ডকুমেন্টরি নির্মাতা নন, তিনি প্রকৃতির এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তাঁর সেই জাদুকরী গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে দুর্গম কোনো অরণ্য কিংবা সমুদ্রের অতল নীল জলরাশি। পুরস্কার আর উপাধির শতধা বিশেষণে স্নাত তিনি, নাইটহুড থেকে শুরু করে এনভায়রনমেন্টাল হিরো সবকিছুই, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল শতকোটি মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা। ভারতের সঙ্গেও অ্যাটেনবরোর সম্পর্ক বহু পুরানো। ইন্দিরা গান্ধীর আমলে ভারতের পরিবেশ-চিন্তকদের বৃত্তে ছিলেন তিনি। ২০১৯ সালে পেয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পুরস্কারও।
ডেভিড অ্যাটেনবরো শিখিয়েছেন, ‘বৈজ্ঞানিক গবেষণা মানুষের ব্যবহারিক চরিত্রকে বদলে দিতে পারে না। গবেষণা করে তথ্য জোগাড় করা এবং তত্ত্ব খাড়া করা নিঃসন্দেহে জরুরি। কিন্তু সেটাই যথেষ্ট নয়। দরকার গল্প বলার। মানুষ গল্পে সাড়া দেয়।’ তাই শতবর্ষে পা রেখেও তরতাজা অ্যাটেনবরো এখনও গল্প বলে চলেছেন।