সুখেন্দু পাল, পালসিট: আপন খেয়ালে ঘুরতে ঘুরতে বাড়ি থেকে অনেক দূরে কাশবনে চলে এসেছে অপু-দুর্গা। অচেনা জায়গা। কাশফুলের নাম জানা নেই। দিদিকে সে জানতে চাইছে, ‘কোথায় এলাম রে। ওগুলো কী রে?’ এমন সময় হঠাৎই যেন কীসের আওয়াজ ভেসে আসছে! দূর থেকে কালো ধোঁয়া উঠে আসছে। অচেনাকে জানার জন্য কাশবন দিয়ে দৌড় লাগাল অপু-দুর্গা। কিছুটা যাওয়ার পর দুর্গা লুটিয়ে পড়ে। তড়িঘড়ি উঠে আবার দৌড়। কিছুটা দূর থেকেই তারা মুগ্ধ হয়ে দেখল রেল ইঞ্জিন। প্রায় ৭২বছর আগে শ্যুট হওয়া ‘পথের পাঁচালী’র সেই দৃশ্য দেখে বাঙালি এখনও নস্টালজিক হয়ে ওঠে। আর পালসিটের বাসিন্দারা তো এখনও মনে করেন, সত্যজিৎ রায় তাঁদেরই লোক। সিনেমার শ্যুটিং করার জন্য স্টেশনের পাশেই দিনের পর দিন কেবিনে থেকেছেন। এলাকার বাসিন্দাদের কাছে সেটা এখনও লালবাড়ি নামে পরিচিত। এই বাড়ি এখনও অপু-দুর্গার স্মৃতি বহন করে চলেছে।
স্থানীয়রা বলেন, জেলার মধ্যে অন্যতম ছোট স্টেশন পালসিট। পথের পাঁচালীর জন্যই এই স্টেশনের নাম সারা বাংলার মানুষ জেনে গিয়েছে। এখনও অনেকেই স্টেশনে নেমে অপু-দুর্গার সেই কাশবনের খোঁজ করেন। সেই কাশের মেলা এখন অবশ্য স্টেশনের পাশে দেখা যায় না। তা বহু আগেই উধাও হয়ে গিয়েছে। স্টেশনের পাশ দিয়ে তৈরি হয়েছে জাতীয় সড়ক। কাশবন না থাকলেও এখনও সেই লালবাড়িটা রয়ে গিয়েছে। তবে সেটা কতদিন থাকবে, তা নিয়ে এলাকার বাসিন্দারা সংশয়ে রয়েছেন। চারদিক ঝোপঝাড়ে ভরে গিয়েছে। ঘরের বিভিন্ন অংশ ভেঙে গিয়েছে। কয়েক বছরের মধ্যে কাশবনের মতো হয়তো এই বাড়িও আর দেখা যাবে না। পালসিটের বাসিন্দা জয়ন্ত হাজরা বলেন, চোখ বন্ধ করলেই অপু-দুর্গার দৌড়ানোর সেই ছবিটা চোখে ভেসে ওঠে। কর্ড লাইনের ধারে সিনেমার শ্যুটিং হয়েছিল। তখন এলাকা ফাঁকা ছিল। শরৎকাল এলেই মাঠ কাশবনে ভরে যেত। এখন তা দেখা যায় না। তবে সত্যজিৎ রায় যে বাড়ি বা কেবিনে বিশ্রাম নিতেন, সেটা এখনও রয়েছে। আগে সেখানে রেলের লোকজন থাকতেন। এখন তা পরিত্যক্ত বাড়িতে পরিণত হয়েছে। এলাকার বাসিন্দা সন্দীপ সরকার বলেন, কেবিনটি সংরক্ষণের জন্য আমরা বহুদিন ধরে লড়ছি। রেলকেও চিঠি দিয়ে জানিয়েছি। ‘পথের পাঁচালী’ শুধু সিনেমা নয়, বাঙালির কাছে অন্য আবেগ। এই জায়গাটি সংরক্ষণ করা দরকার।
স্থানীয়রা বলছেন, সত্যজিৎ রায় পথের পাঁচালীতে পালসিট স্টেশনের যে ছবি এঁকে দিয়েছিলেন, তা বাঙালির মনে থেকে গিয়েছে। কাশফুল, নীল আকাশে সাদামেঘের আনাগোনা, আর অপু-দুর্গা, শরৎকালে একইসঙ্গে উচ্চারিত হয়। সেই দৃশ্যপট হারিয়ে গিয়েছে। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের স্মৃতি ধরে রাখতে বাঁচিয়ে রাখা হোক লাল বাড়িটিকে। এমনটাই চাইছে পালসিট।-নিজস্ব চিত্র