হিমাংশু সিংহ: পরিবর্তনের পর গেরুয়া শাসনে প্রথম ভোট দেখল বাংলা। আগে যে মহল্লায় জাহাঙ্গিরের দৌরাত্ম্যে মানুষ অতিষ্ঠ ছিল, সেখানে পালটা কোনো ‘বাবর’-এর উত্থান এখনো হয়নি বটে, তবে বুকে হাত দিয়ে কি বলা যায় যে অদূর ভবিষ্যতেও হবে না? সরকারের শূন্যপদ বছরের পর বছর ফাঁকা থাকলেও এলাকার ডনের পদে কোনো জমানাতেই লোকের অভাব হয় না। এক্ষেত্রে শূন্যস্থান পূরণ না হওয়া নেহাতই অলীক চিন্তা। এত কাণ্ডের পরও বলুন তো, ফলতায় রাজনৈতিক ভারসাম্য ফিরল কি ষোলোআনা? নাকি বদলের সমাপতনেও গত পঞ্চাশ বছরের ধারা মেনেই পুনর্নির্বাচনে একতরফা ভোটই বাংলার ভবিতব্য! শাসক বদলায়, পরিস্থিতির পরিবর্তন হয় না। কে না জানে, যেকোনো পুনর্নির্বাচনে রাশ সবসময়ই ক্ষমতার দিকেই আশি শতাংশ ঢলে থাকে! অসম্ভব শোনালেও মোট প্রদত্ত ভোটের সিংহভাগই দখল করে একটি দল। মাত্র আড়াই সপ্তাহ আগে রাজ্যের ক্ষমতা কার হাতে যাবে, সেই প্রশ্নের নিষ্পত্তির পর যা নিতান্তই দস্তুর! শাসকের সরল সোজা সমীকরণ মেনেই দিনের শেষে ফলতা কিন্তু রইল ফলতাতেই। পালাবদলেও বদলালো না ‘ট্র্যাডিশন’। কোথাও তৃণমূল নেই, শুধুই বিজেপি। মাঝামাঝি কিছু হয় না। ভবিষ্যৎ-ই বলবে বাম, তৃণমূল শাসনের একতরফা ভোটদানের চিত্র গেরুয়া জমানায় শেষ পর্যন্ত পক্ষপাতহীন থাকতে পারল কি না।
২৯ এপ্রিলের ভোটে দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই কেন্দ্রে গেরুয়া পতাকা খুঁজে পেতেই অসুবিধা হচ্ছিল। দেদার আধাসেনা, উত্তরপ্রদেশের ‘সিংঘম’ খ্যাত পুলিশকর্তা, সতর্ক নির্বাচন কমিশনের চোখ এড়িয়ে ইভিএমে সেলোটেপ, সুগন্ধি মাখিয়ে রাখার ঘটনা যেমন প্রশাসনিক ব্যর্থতার ছবিকেই তুলে ধরে, তেমনি পালাবদলের সুগন্ধ মাখা ২১ মের ভোটও দেখল বড্ড চেনা উলটপুরাণ। ‘পুষ্পা’ ঝুঁকেছে সত্যি, কিন্তু ফলতা কি নিজেকে বদলাতে পারবে? ৪ মে ফল প্রকাশের দুপুর ১২টা থেকেই কোন জাদুদণ্ডের ছোঁয়ায় আনাচে কানাচে গলি রাজপথের সব জোড়াফুল নিমেষে পদ্মে রূপান্তরিত? সবুজ মুছে যেদিকে চোখ যায় শুধুই গেরুয়া! একুশ দিন আগে যে তল্লাটে মহল্লায় সবাই ছিল জোড়াফুল, আজ নিশুতি রাতে ‘অবনী বাড়ি আছো’ ডাক দিলেও সহজে কেউ সাড়া দিতে রাজি নন। এটাই পালাবদলের অনিবার্য সাইডএফেক্ট! এ থেকেই জন্ম হয় নতুন ভয়, অকারণ আনুগত্য এবং লাগামহীন সন্ত্রাসের। এককথায় বাড়াবাড়ির, যা খতম করার অঙ্গীকার রয়েছে শমীকবাবুদের সংকল্পপত্রের ছত্রে ছত্রে। বাস্তবে কী হবে তা সময়ই বলবে। গেরুয়া জমানাতেও ত্রিপুরার পঞ্চায়েত ভোটের বেশিরভাগ নিষ্পত্তি হয়েছে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। উত্তরপ্রদেশের ডবল ইঞ্জিনে এনকাউন্টারে খতম হয় একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের ৩০০ জন। এসবই একতরফা আস্ফালনের নমুনা, যা জনগণ মোটেই ভালো চোখে দেখে না।
মাত্র দু-বছর আগে ডায়মন্ডহারবার কেন্দ্রে অভিষেকের ৭ লক্ষ ১০ হাজার ভোটে জয় নিয়ে যারা কটাক্ষ করত পরিবর্তিত ফলতায় বিজেপি প্রার্থীর বিশাল জয়ের আগাম গন্ধ পেয়ে আহ্লাদিত কিন্তু তারাই। চব্বিশেও ফলতায় যুবরাজের এগিয়ে থাকার মার্জিন ছিল ১ লক্ষ ৬৫ হাজার। নিঃসন্দেহে অস্বাভাবিক। ক্ষমতাই শেষ কথা বলে, পুলিশ, সিকিউরিটি পাশ থেকে সরলেই আস্ফালনের ঝাঁপিও নিমেষে শূন্য! গদি দখলের অমোঘ অনুপ্রেরণাতেই আগামী মঙ্গলবারের লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে গেরুয়া জয়ের অপেক্ষায় সবাই। নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে, আগামী লোকসভা ভোটে এই ব্যবধান বিজেপির পক্ষে আরো বাড়বে। এই মহল্লায় ২০০৬ সাল পর্যন্ত বামেদের ‘লাঠি’ চলত। আর কোনো দল, মত, বিশ্বাসের প্রবেশ নিষেধ ছিল। ২০০৯ সালের লোকসভা থেকে তা তৃণমূলের হাতে। ১৭ বছর পর ব্যাটন চলে গেল গেরুয়া হাতে। রং বদলায়, ঢং পালটে যায়, কিন্তু আইনের শাসনের প্রতিশ্রুতি সময় গেলেই শাসকের দৌরাত্ম্যের ধারাপাতে ফিকে হয়ে যায় বেমালুম। শুধু বদলায় না সাধারণ মানুষের অবস্থা। পরিণতি পায় না রুটিরুজির লড়াই। জনমানসের এই বদ্ধমূল ধারণাকে ভুল প্রমাণ করা মোটেই খুব সহজ কাজ নয়। সেই চ্যালেঞ্জকে সঙ্গে নিয়েই বাঘের পিঠে সওয়ার হওয়ার দ্বিতীয় পর্বে সামনে শুভেন্দুবাবু। প্রথম দফায় গত পাঁচবছর তাঁর লড়াই ছিল মমতাকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসার। তিনি তা পেরেছেন। এখন তাঁকে প্রমাণ করতে হবে চূড়ান্ত ক্ষমতায়ন কোনো অবস্থাতেই ভয় দেখায় না, দুর্নীতিও করে না। স্রেফ উন্নয়নকেই ত্বরান্বিত করে। কাজটা কঠিন। নতুন সরকারের উচিত, সব মত ও সম্প্রদায়ের প্রতি সমান মনোভাব নিয়েই চলা। এই আর্থ-সামাজিক পরিবেশে সেই অসম্ভবকে সম্ভব করার গুরুদায়িত্ব যাঁর কাঁধে, অধিকারী পরিবারের সেই সফল সন্তানকে অত্যন্ত সংযত এবং সতর্ক থাকতে হবে। ভুলচুক হলেই জনতার আকাশপ্রমাণ আশায় চোনা পড়বে। ধৈর্যচ্যুতি ঘটবে। জনসমর্থনের সম্মোহন ভাঙতে কিন্তু খুব বেশি সময় লাগে না। যেমন ধূমকেতুর মতো আসে তেমনি আচমকাই উধাও হয়ে যায় কিছু না বলেই।
নীল পেঁজা মেঘের তুলোয় ঠাসা আশমানে বাড়ি বানানোর কথা ছোটোবেলা থেকে অনেক শুনেছি। কিন্তু স্বপ্নের সরকার? শুভেন্দুবাবু এখন অমিত শাহের দেওয়া ভরসার প্রতিশ্রুতি রক্ষায় মাঠে নেমেছেন। শিল্প শ্মশান। চাকরি নেই। চাকরি কিছু হলেও সেসব বিক্রি হয়েছে খোলাবাজারে। অবৈধ প্রোমোটারির শিকড় আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে বসেছে। ছুটছেন আর পিছন থেকে মোদি অমিত শাহের উৎসাহ আর ভোকাল টনিক ভেসে আসছে...ফাইট শুভেন্দু ফাইট! কাটমানি থাকবে না। সিন্ডিকেটরাজ উধাও। আগাগোড়া শুধু ভরসা আর আস্থার ঘেরাটোপে বেঁধে বেঁধে থাকার। কেউ দোকান খুললেই চাতক পাখির মতো দালালরা হাত পাতবে না, বাড়ির একটা কার্নিশ দু-ইঞ্চি বাড়ালেও এলাকার দাদারা হাত পেতে পয়সা চাইবে না। রাস্তায় হকার বসিয়ে টাকা তোলার সংস্কৃতির অবসান দেখতে উদগ্রীব রাজ্যের মানুষ। বাড়ির সামনে বালি পড়লেই দিতে হবে না উৎকোচ। কারো জমি কেউ অন্যায়ভাবে দখল করবে না। পুকুর ভরাট করলেই জেল ও জরিমানা কার্যকর হবে রং না দেখে। জেলায় জেলায় পুরসভা ও পঞ্চায়েতের এই সমান্তরাল প্রশাসন যদি খতম হয় তাহলে মানুষ সাধুবাদ দেবে। এসব শুনতে ভালো। ইস্তাহারেও ছাপা অক্ষরে দেখতে এবং পড়তে ভালো। কিন্তু দু’মাস পরই যদি আবার যে কে সেই অবস্থা হয়! যদি দেখা যায় রং বদল হল, হাত বদল হল কিন্তু তোলাবাজির উপদ্রব কমল না। শুধু সানগ্লাস আর আড়াই ভরির সোনার চেন গলায় ঝুলিয়ে নতুন নায়কের আবির্ভাব হল এলাকায় এলাকায়। কিংবা বেতন কমিশন এবং রাজ্য সরকারি কর্মীদের ডিএ সমস্যা যদি ঝুলেই থাকে, কেন্দ্রের সমহারে চালু করতে টালবাহানা শুরু হয়, সেক্ষেত্রে এই সরকারের উত্তুঙ্গ জনপ্রিয়তাও ধাক্কা খেতে বাধ্য কালের নিয়মে। প্রত্যেক মানুষের মতো সরকারও তার জীবনচক্র পূর্ণ করলেই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা গ্রাস করে। যাঁরা পালাবদল প্রত্যক্ষ করেছেন একথা তাঁদের বিলক্ষণ জানা।
স্বীকার করতে বাধা নেই, সাতাত্তরে যখন সিপিএম ক্ষমতায় এসেছিল তখনো এই আশাটা ছিল। এগারো সালেও অনেক স্বপ্ন ফেরি দেখেছিলাম। কিন্তু সরকারের বয়স বাড়লেই বেনোজল হুড় হুড় করে ঢোকে। এটাই ভারতীয় গণতন্ত্রে নির্বাচিত সরকারের অনিবার্য দেওয়াল লিখন। ডান-বাম, নীল লাল গেরুয়া কেউ এই বৃত্তের বাইরে নয়। উত্তরপ্রদেশ থেকে ভোপাল, মুম্বই থেকে দিল্লি—ডবল ইঞ্জিনের সামনে চ্যালেঞ্জটা তাই নিঃসন্দেহে কঠিন। কঠিন এজন্যই যে, গত অর্ধশতাব্দীজুড়ে এমন স্বপ্নের সরকারের দেখা মেলেনি। এমনকি, তার আগেও নয়।
এখনো একমাস পেরোয়নি পরিবর্তনের সরকারের। কারো ভালোমন্দ সাফল্য-ব্যর্থতা বিচার করার সময় এটা নয়। তবে নিশ্চিতভাবে বদল অনুভব করার পক্ষে সরকারের প্রথম ১৫ দিনই যথেষ্ট। সেই বদলের ঘ্রাণ কি মিলেছে? অনেক গ্রেপ্তার চারদিকে। জেলা থেকে শহর, উত্তর থেকে দক্ষিণ। মাঝারি মাপের নেতা থেকে পঞ্চায়েত প্রধান, বিভিন্ন পুরসভার কাউন্সিলার এমনকি এই সেদিনের মন্ত্রীও। এবারো ভোটের ফল বেরোনোর পর সংঘর্ষ থামানো গেল না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে এবং তদন্তে তার সারবত্তা আছে বলে ইঙ্গিত পেলে গ্রেপ্তারি নিশ্চিত প্রক্রিয়া। আইন আইনের পথে চলবে। তাতে আশ্চর্যেরই-বা কী থাকতে পারে? কিন্তু তা বলে কোনো গ্রেপ্তারিই যেন প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে না-হয়। প্রতিহিংসা, ঘৃণা, বিভেদ এসবই সমাজটাকে ছোটো ছোটো ভাগে বিভক্ত করার হাতিয়ার। ওই বিষ থাকলে সোনার বাংলা কি গড়া যায়?
সবশেষে বলি, শুভেন্দুবাবু, যাঁরা আপনাকে ভোট দিয়েছেন আপনি যেমন তাঁদের মুখ্যমন্ত্রী, তেমনি যাঁরা দেননি তাঁদেরও—ইতস্তত করে এখনো যাঁরা দূরে তাঁদেরও—মায় সংখ্যালঘু শ্রেণিরও। পার্কসার্কাস থেকে রাজাবাজার—শৃঙ্খলারক্ষা যেমন বর্তমান সরকারের দায়িত্ব, তেমনি হিন্দু মহল্লাতেও শান্তি-সুস্থিতি বজায় রাখা কর্তব্য। সবাইকে সঙ্গে নিয়েই আপনাকে সোনার বাংলা গড়তে হবে, কাউকে বিচ্ছিন্ন করে কিংবা কাঁদিয়ে নয়। একাজে কারো প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ হওয়া কোনো
রাজধর্মপালনকারীর সাজে না। দোষীদের শাস্তি হোক। ধরপাকড় চলুক। কিন্তু সবটাই যেন রাজ্যের জন্য, মানুষের স্বার্থে হয়। মানুষ কিন্তু সতর্ক ও সজাগ সর্বদা। জনসমর্থনের রসায়ন ও চরিত্র বড়োই অদ্ভুত পথে চলে। কোনো শাসক তার তল খুঁজে পায় না। আবারও বলছি মাত্র দু’সপ্তাহ একটা সরকারকে যাচাই করার পক্ষে যথেষ্ট নয়। আমরা অপেক্ষা করব, সতর্ক করব এবং ভুলচুক দেখলেই তুলে ধরব।