Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

‘জন্মেরও প্রথম শুভক্ষণ’

প্রতীকী। তবু শনিবার, রবীন্দ্র জয়ন্তীর পুণ্যলগ্নে ব্রিগেডের সবুজ ময়দান ঢাকল গেরুয়া রং-এ। এতকাল অগুনতি ঐতিহাসিক সমাবেশের সাক্ষী থেকেছে ব্রিগেড। এদিন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রথম সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের সাক্ষী থেকে এক নতুন নজির গড়ল কলকাতার ‘ফুসফুস’।

‘জন্মেরও প্রথম শুভক্ষণ’
  • ১০ মে, ২০২৬ ০৬:২৬
Prefer us on Google

প্রতীকী। তবু শনিবার, রবীন্দ্র জয়ন্তীর পুণ্যলগ্নে ব্রিগেডের সবুজ ময়দান ঢাকল গেরুয়া রং-এ। এতকাল অগুনতি ঐতিহাসিক সমাবেশের সাক্ষী থেকেছে ব্রিগেড। এদিন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রথম সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের সাক্ষী থেকে এক নতুন নজির গড়ল কলকাতার ‘ফুসফুস’। ব্রিগেড ময়দানের বয়স অন্তত পৌনে তিনশো বছরের। ইতিহাস বলছে, ১৭৫৮ সালে কলকাতার একেবারে কেন্দ্রে গোবিন্দপুরে ফোর্ট উইলিয়ম তৈরির কাজ শুরুর পরেই সংলগ্ন জঙ্গল কেটে সাফ করে ইংরেজরা। জন্ম নেয় এক সবুজ ময়দানের, যা আজকের ব্রিগেড। স্বাধীনতার আগে এখানে প্রায়শই সেনা মহড়া চলত। স্বাধীন ভারতে ১৯৪৯ সালে এখানেই প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের সমাবেশে ভাষণ দেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। মৃত্যুর পর নেহরুর চিতাভস্মও রাখা হয়েছিল এই ব্রিগেডে। এই ময়দান ১৯৫৫-৫৬ সালে রাশিয়া চীনের সর্বোচ্চ নেতাদের অভিবাদন, ১৯৭২-এ মুজিবুর রহমান-ইন্দিরা গান্ধীর জ্বালাময়ী ভাষণ, জরুরি অবস্থার পর ’৭৭-এ জয়প্রকাশ নারায়ণের জনসভার সাক্ষী থেকেছে। বামেদের ৩৪ বছরের শাসনে একাধিকবার লাল ঝড়ের সাক্ষীও এই মাঠ। ১৯৮৬ সালে এই ময়দানে পা রাখেন পোপ দ্বিতীয় জন পল। ১৯৯০-তে বিজেপি প্রথম সভা করে এখানে। ব্রিগেড দেখেছে ’৯২-তে মমতার ডাকা সভায় বামফ্রন্টের মৃত্যুঘণ্টা বাজাতে। আবার ২০১১-তে বাম সরকারকে হটিয়ে এই মাঠেই হয়েছিল তৃণমূলের ‘বিজয় দিবস’ পালন। ব্রিগেড সাক্ষী থেকেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একাধিক জনসভারও। রবীন্দ্র জয়ন্তীর পুণ্যতিথিতে শনিবার অন্য এক সমাবেশের সাক্ষী থেকে নতুন ইতিহাস রচনা করল ব্রিগেড। ময়দানের কতকথায় যোগ হল এক নতুন অধ্যায়। বাংলায় প্রথম বিজেপি সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান, যেখানে গড় হয়ে প্রণাম করে বঙ্গবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মোদি। এই দৃশ্য বঙ্গবাসীর মনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। 

Advertisement

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখল যে বিজেপির কাছে অন্য যেকোনো রাজ্যের থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এদিনের শপথ অনুষ্ঠানের নক্ষত্র সমাবেশ যেন সেটাই বুঝিয়ে দিল। কে ছিলেন না এই অনুষ্ঠানে? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তো বটেই, মঞ্চ আলো করেছিলেন কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, কেন্দ্রীয় স্তরের প্রথম সারির একঝাঁক নেতা এবং ২০টি বিজেপি, এনডিএ শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা। এককথায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে ‘জায়েন্ট কিলার’ হিসাবে খ্যাত শুভেন্দু অধিকারীর মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আক্ষরিক অর্থেই যেন গোটা দেশের বিজেপির ‘হুজ-হু’রা এসে হাজির হয়েছিলেন। মন্ত্রীদের শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজনও ছিল চোখ ধাঁধানো। বিজেপি ‘বাংলা ও বাঙালি বিরোধী’ বলে যে প্রচার ছিল, তা ভুল প্রমাণ করতে এদিন বাঙালি পোশাক, বাঙালি সংস্কৃতি, বাঙালি খাবার, বাংলায় শপথবাক্য পাঠ করে যেন পালটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হল। নিখাদ বাঙালিয়ানা। অনুষ্ঠানের মূল মঞ্চের ব্যাকড্রপে ছিল দুর্গা, কালীমন্দির, ধুনুচির সমাহার। আর ছিলেন তিনি, বাঙালির প্রাণের ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ। ২৫ বৈশাখের এই দিনটিকে শপথের জন্য বেছে নেওয়ার পিছনে যে বিজেপির বাঙালির দল হয়ে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা, তা মনে করেন অনেকে। সন্দেহ নেই, বর্ণে, গন্ধে, ছন্দে গীতিতে সেই প্রয়াসে সফল বিজেপি। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্ন পূরণ করে তাদের প্রথম মন্ত্রিসভার শপথে ব্রিগেড ষোলোয়ানার জায়গায় আঠারোয়ানা ছিল বাঙালিয়ানায় ভরপুর। 
শপথগ্রহণ মানে তো প্রতিশ্রুতি পালনের চ্যালেঞ্জ শুরুর লগ্নও। ক্ষমতায় এলে বিজেপির নতুন সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভাতা বাড়িয়ে, স্থায়ী কর্মসংস্থান ও লগ্নির ব্যবস্থা করে রাজ্যের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে প্রকৃত পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রতিশ্রুতি রয়েছে, ভয় নয়, প্রতিটি নাগরিকের ভরসা হয়ে উঠবে এই সরকার। রাজ্যে নারী সুরক্ষা, নারীদের ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি—সেদিকেও নতুন সরকারের সমান নজর দেওয়ার অঙ্গীকারের কথা শোনা গিয়েছে। সন্দেহ নেই, এইসব প্রতিশ্রুতিই বিজেপিকে বিপুল গরিষ্ঠতা পেতে সাহায্য করেছে। কিন্তু ৪ মে ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর গত কয়েকদিনে বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনাও নাগরিক সমাজে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। তবে এসব প্রতিরোধে বিজেপি নেতৃত্ব কড়া বার্তাও দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও কোথাও মন্দিরের অদূরে বিরিয়ানির দোকান ভেঙে ফেলার হুমকি, কোথাও হিজাব পরে কলেজে ঢোকার নিষেধাজ্ঞা জারি, কোথাও লেনিনের মূর্তি ভেঙে ফেলা, কোথাও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের দোকান ভাঙচুরের ঘটনা অন্যান্য বিজেপি শাসিত রাজ্যের সংস্কৃতিকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। আশা করা যায়, নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুবাবু এসব বরদাস্ত করবেন না। সঠিকভাবেই ফলাফল ঘোষণার পর গুন্ডামি, তোলাবাজির বিরুদ্ধে বঙ্গের বিজেপি নেতারা ‘জিরো টলারেন্স’-এর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। যা খুবই জরুরি উদ্যোগ। কিন্তু খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, কারও ওপর আক্রমণ না করা, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রেও নতুন সরকার ও শাসক দল সমান হুঁশিয়ারি দেবে— এটাই প্রত্যাশিত। যাত্রা শুরুর সময়েই একটি সুখবরও এসেছে। একলপ্তে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার কেন্দ্রীয় বরাদ্দ পেল বাংলা, যা এককথায় নজিরবিহীন। বঙ্গবাসী আশাবাদী। তবু মনে রাখা প্রয়োজন রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক পরিমণ্ডল বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবেই হবে রাজ্যের প্রকৃত মঙ্গল ও অগ্রগতি।

সম্পর্কিত সংবাদ