অর্পণ সেনগুপ্ত, কলকাতা: ফুরফুরায় ঢোকার আগে উজ্জ্বলপুকুরের পাশে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল এক তরুণের সঙ্গে। প্রতিবেদকের মোটরবাইক দেখে লিফট নিতে ছুটে এসেছিলেন। তবে, গন্তব্য উলটোদিকে শুনে নিজেই থমকে গেলেন। কথা এগলো এলাকার রাজনীতির দিকে। রীতিমতো ধর্মীয় পোশাকে সজ্জিত সেই তরুণ নিরাপত্তার কারণেই নাম গোপন রাখার অনুরোধ জানালেন। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, জাঙ্গিপাড়ায় এবার পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। হুগলির এই কেন্দ্রেই রয়েছে ফুরফুরা শরিফ। রাজনৈতিক দল আইএসএফের সূচনাও এখানে। তরুণের বক্তব্য, আইএসএফের কিছু ভোট সিপিএম প্রার্থী পেলেও তাতে বড়ো কিছু হেরফের হবে না।
সন্ধ্যার দিকে জাঙ্গিপাড়া পাওয়ার সাব স্টেশনের কাছে আড্ডা মারছিল একদল সদ্য তরুণ। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে বেশ সাবধানী হয়ে গেলেন অনেকেই। সরাসরি প্রশ্ন ছিল, কী হবে ভোটে? সাহস করে একজন বলে ফেললেন, ‘যারা আছে তারাই...’ এই মুডটাই পাওয়া গেল শিয়াখালা, মশাটের কিছু অংশে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে। স্থিতাবস্থাই চাইছে জাঙ্গিপাড়া। উন্নয়নের গতি আরও জোরদার হোক, এটাই দাবি। প্রায় ২৬ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটারের কেন্দ্রে হিন্দু-মুসলমানের মিলেমিশেই বাস। মাজার মসজিদের অনতিদূরেই চোখে পড়ে রক্ষাকালীর মন্দির বা শিবমন্দির। এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকেই ‘স্ট্যাটাস কুউও’ হিসেবে রাখতে চান সাধারণ মানুষ।
প্রচারে ঝড় তুলেছেন তৃণমূল প্রার্থী, রাজ্যের বিদায়ী পরিবহণ মন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী। তিনবারের বিধায়ক গাড়ি ছাড়াও অটো, টোটো বা মোটরবাইকে চলে যাচ্ছেন প্রত্যন্ত এলাকায়। এ প্রসঙ্গে স্নেহাশিসের বক্তব্য, ‘আমার লড়াই শুধু বিরোধীদের সঙ্গে নয়। অনুন্নয়ন মুছে দেওয়ার সঙ্গেও। এভাবে প্রচার করে কোথাও যদি একটা কাঁচা রাস্তা বা কাঁচা বাড়ি দেখি, সেটা নোট করে রাখছি। সেগুলি পাকা করার লড়াই শুরু করব ভোটে জেতার পরে।’ একটি তত্ত্ব ভাসছে, ফুরফুরার একাংশ কিছুটা বেঁকে বসেছে। তাতে কি লড়াই কিছুটা কঠিন হবে? এসব উড়িয়ে দিচ্ছেন স্নেহাশিস। তিনি বলেন, ‘গত ভোটেও কোথাও কোথাও স্থানীয় ইস্যুতে কিছু কর্মী বসে গিয়েছিলেন। তবে, এবার বিজেপিকে হারাতে সবাই কোমর বেঁধে নেমেছেন। ফুরফুরাতেও একাধিক স্থানীয় নেতা তৃণমূলের হয়ে কাজ করছেন। ফলে ব্যক্তিবিশেষ ফ্যাক্টর হবে না।’ জিতবেনই, এই আত্মবিশ্বাস কোথা থেকে পাচ্ছেন? তাঁর বক্তব্য, ‘লোকসভা ভোটে গত বিধানসভার চেয়েও ভোটের হার বেড়েছে তৃণমূলের। তাছাড়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়ন জাঙ্গিপাড়া জুড়ে ছড়িয়ে দিতে পেরেছি। মডেল হাসপাতাল, মডেল থানা, রাস্তাঘাট চওড়া ও পাকা করার মতো কাজ তো আছেই। তাছাড়া লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথী কার্ড এবং সরকারের অন্যান্য প্রকল্প সমাজের নীচুতলা পর্যন্ত পৌঁছেছে। এগুলিই ডিভিডেন্ড দেবে।’ যেহেতু তিনি পরিবহণ মন্ত্রী, তাই এলাকায় তার পরিস্থিতি কেমন, সেকথা উঠবেই। ঝাঁ চকচকে জাঙ্গিপাড়া বাসস্ট্যান্ডে কোনো বাস নেই কেন? মন্ত্রী স্বীকার করছেন, বিরোধীরা এ নিয়ে প্রচার করছে। তবে, সেই বাসস্ট্যান্ড তিনিই সংস্কার করেছিলেন। সরকারি বাসের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে জাঙ্গিপাড়া ছাড়িয়ে রাজবলহাটের মতো এলাকা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আরও কয়েকটি সরকারি বাস আরও গ্রামীণ এলাকা থেকে ছাড়ে। রুটে জাঙ্গিপাড়া পড়ে। তাই বাসস্ট্যান্ডে বাস দেখা না গেলেও সমস্যা নেই। তবে, তিনি স্বীকার করেছেন টোটো, অটো বা ট্রেকারের দাপটে জাঙ্গিপাড়া-শ্রীরামপুর বেসরকারি বাস রুটটি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এত লোকের রুটি-রুজি জড়িয়ে রয়েছে বলে অটো বা টোটো একলপ্তে বন্ধ করার উপায় নেই।
বিভিন্ন মন্দিরে পুজো দিয়ে প্রচার শুরু করছেন বিজেপি প্রার্থী প্রসেনজিৎ বাগ। বসন্তপুরে একটি সভা শেষ করে বললেন, ‘জাঙ্গিপাড়ার মানুষ পরিবর্তন চাইছেন। তাঁদের এই ইচ্ছাশক্তিই আমাদের হাতিয়ার। দলীয় কার্যালয় ছাড়া বিধায়কের সঙ্গে দেখা করার জো নেই সাধারণ মানুষের। কারণ ১৫ বছরে তিনি কোনো অফিস তৈরি করেননি। আলুচাষিদের সঙ্গেও প্রতারণা করেছে এই সরকার। তাছাড়া, রাষ্ট্রবাদী বহু মুসমিল বিজেপিকে ভোট দিতে তৈরি। ১০০ শতাংশ মুসলিমের বাস, এমন গ্রামে প্রচারে গিয়েও সাড়া পাচ্ছি। এবার আর রিগিং করতে পারবে না তৃণমূল। তাই আমরাই জিতব।’এলাকায় ঘুরে চোখে পড়েছে সিপিএম প্রার্থী সুদীপ্ত সরকারের সমর্থনে চলছে টোটো-প্রচার। লাল ঝড় আসছেই, ঘোষণা চলছে মাইকে। তবে, গত বছর এখানে বাম সমর্থিত আইএসফ প্রার্থী পেয়েছিলেন মাত্র ৮.৪৪ শতাংশ ভোট। আর ৪৮.৪২ শতাংশ ভোট পেয়ে স্নেহাশিস বিজেপি প্রার্থীর চেয়ে এগিয়ে ছিলেন প্রায় ১৭ হাজার ভোটে। লোকসভা নির্বাচনে সেই ব্যবধান আরও বেড়েছে।