অভিজিৎ চৌধুরী, চুঁচুড়া: ঐতিহ্যের এক বেনজির সমন্বয়ের ভূমি চুঁচুড়া। চুঁচুড়ায় আছে ব্যান্ডেল চার্চ, ডাচ কবরস্থান, মোগল আমলের দয়াময়ী কালীমন্দির, ইমামবাড়া। আছে ব্যান্ডেলের ‘মিনি ভারতবর্ষ’। আর আছে সুগঠিত অতীত। সেখানেই চুঁচুড়ার মাধুর্য ও রহস্য। চুঁচুড়ার ভোট রাজনীতির এক রহস্যময় অধ্যায় হল, নির্বাচনের ধরন অনুসারে দল পছন্দের প্রবণতা। অর্থাৎ একাংশের মানুষ লোকসভা ভোটের নিরিখে একটি দলকে ভোট দিলেও বিধানসভায় অন্য দলকে ভোট দেয়। চুঁচুড়ার রাজনীতি সচেতন মানুষজন বলেন, এমন ঘটনা হুগলির অন্যত্র সেভাবে ঘটে না।
চুঁচুড়ার ঘড়িমোড়ে আছে ঘড়িমিনার। তার গায়ে লেগে আছে ইংরেজ শাসনের আভা। আছে বাঙালির আড্ডা সংস্কৃতির প্রবাহ। ঘড়িমোড়কে ঘিরে প্রতিদিন বসে আড্ডা। সেখানেই তিন প্রবীণের কথোপকথনে এসেছে ‘নির্বাচনভিত্তিক পছন্দের তত্ত্ব’। এক প্রবীণ বলেন, দেখবি গত ১৪ বছরে লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল চুঁচুড়ায় বারবার কম ভোট পেয়েছে। অথচ, বিধানসভায় প্রতিবার একলাফে অনেকটা ভোট বেড়েছে। আরেক প্রবীণ বলেন, চুঁচুড়ার নাগরিকদের মধ্যে চিন্তার বনেদিয়ানা এখনও আছে। নির্বাচনভিত্তিক দল বাছাই, তারই ফসল। তিন প্রবীণই সম্ভ্রান্ত, কিন্তু নাম-পরিচয় জানাতে চাননি। তবে একটি সূত্র উসকে দিয়েছেন। তৃতীয় প্রবীণ বলছিলেন, এবারও ভিন্ন নির্বাচন, ভিন্ন ভোট হবে। তবে বিজেপির জন্য বড়ো সমস্যা প্রাক্তন সাংসদ লকেট চট্টোপাধ্যায়ের সময়কাল। সেই ক্ষত আজও দগদগে।
চুঁচুড়ার রণাঙ্গনে বৃদ্ধদের দেওয়া সূত্র খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল, পুরানো চাল সত্যিই ভাতে বাড়ে। বিজেপির প্রাক্তন সাংসদ (২০১৯-২০২৪) এবারের নির্বাচনে কোথাও না থেকেও তীব্রভাবে আছেন। তিনি আছেন দলের অন্দরে, নাগরিকদের ক্ষোভে। দলের অন্দরের আলোচনা, এবারের প্রার্থী সুবীর নাগ, লকেটেরই পোস্টার বয়। নির্বাচনের ফলাফলের উপরে তাঁর দলে ফের ক্ষমতা পাওয়া বা না পাওয়া নির্ভর করবে। এক পদ্মকর্মী বলেন, আমাদের প্রাক্তন সাংসদ এমন কিছু কাজ করেননি, তা চোখে পড়ার মতো। অথচ তিনি দলের মধ্যে হিটলারি শাসন চালাতেন। সে এক দমবন্ধ পরিবেশ ছিল। সুবীরবাবু সেই হিটলারেরই প্রধান সেনাপতি। এক বিজেপি সমর্থক হতাশার সুরে বলেন, অনেকেই বলছেন, তোমাদের সাংসদ চুঁচুড়াকে বিকলাঙ্গ করে ছেড়েছে। তাছাড়া এখন বিধানসভা ভোট। তাই চা খাও, কিন্তু ভোট চাইবে না। প্রাক্তন সাংসদ খুব বিপদে ফেলে গিয়েছেন আমাদের।
বিষয়টি জানেন চুঁচুড়ার তৃণমূল প্রার্থী দেবাংশু ভট্টাচার্য। তাই প্রাক্তন পদ্ম-সাংসদের কথা তিনিও প্রচারে আনছেন। দেবাংশু বলেন, কেন্দ্রে বিজেপির সরকার এবং চুঁচুড়ায় বিজেপির সাংসদ, এই যুগলবন্দিতে কি উন্নতি হয়েছে? উত্তরটা মানুষ জানেন। তাই জুমলা-ভাঁওতা আর চলবে না। রাজ্যে উন্নয়নের নবজোয়ার এনেছেন মমতা-অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, সেই ‘ডবল ইঞ্জিন’ মানুষের ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছে চুঁচুড়ায়। বিজেপির সুবীরবাবু বলেন, যে দল রাজ্যটাকে শ্মশান করেছে, অনিয়মের সাম্রাজ্য গড়েছে, বাংলাকে ধর্ষণের রাজধানী করেছে, তাদের মানুষ চিনে নিয়েছে। এবার অতীতের গল্পগাছায় ভোট হবে না। পরিবর্তনের জোরালো হাওয়া উঠে গিয়েছে। শাসক-বিরোধী দ্বন্দ্বের মাঝে বামেদের এবারের লড়াই অনেকটা ভিন্নমুখী। গত কয়েকটি নির্বাচনে বামেদের ‘রক্তদান’ই সতেজ করেছে সংগঠনহীন কঙ্কালসার বিজেপিকে। এবার সেই ধারা বদলানোই বামেদের মুখ্য চ্যালেঞ্জ। ফরওয়ার্ড ব্লকের প্রার্থী সুনীল সাহা বলেন, তৃণমূল-বিজেপি দু’দলই গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। এবার ইভিএমে তার জবাব মিলবে।
শেষ জবাবটা তাহলে কি? বাংলা সাহিত্যের দিকপাল বুদ্ধদেব বসু তাঁর বিখ্যাত ‘প্রথম পার্থ’ নাটকে দুই বৃদ্ধকে দিয়ে মহাভারতের মহা-জটিলতার উত্তর দিয়েছিলেন। চুঁচুড়ার তিন বৃদ্ধের আড্ডাও ঐতিহাসিক হতে পারে। কারণ, হুগলির গঙ্গা বহুবার গতিপথ বদলালেও চুঁচুড়া তার সাবেক ঐতিহ্য বদলের লক্ষণ এখনও দেখায়নি।