সংবাদদাতা, কৃষ্ণনগর: কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর অন্যতম আকর্ষণ ঐতিহ্যবাহী মঙ্গলঘট ভাসান। প্রতিমা নিরঞ্জনের আগে শহরের বিভিন্ন ক্লাব ও বারোয়ারির উদ্যোগে বের হয় এই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। তবে প্রতিবছরই ঘট ভাসান শুরু হতে দেরি হওয়ায় তা শেষ হতে সন্ধ্যা গড়িয়ে যায়। ফলে প্রতিমা নিরঞ্জন পর্বেও বিলম্ব ঘটে। সেই সমস্যা মেটাতে এ বছর শোভাযাত্রার সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দিল প্রশাসন। সকাল ১০টায় শুরু করে দুপুর ২টোর মধ্যে মঙ্গলঘট ভাসান শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বিঘ্নে বিসর্জন সম্পন্ন করতে শহরজুড়ে থাকছে কড়া নিরাপত্তা ও নজরদারি।
আগামী ১৯ নভেম্বর কৃষ্ণনগরে মঙ্গলঘট ভাসান হবে। ঐতিহ্য মেনে দুপুরে এই শোভাযাত্রার আয়োজন করা হলেও এ বছর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা শেষ করতে জোর দিচ্ছে প্রশাসন। সকাল ১০টার মধ্যে শোভাযাত্রা শুরু করে দুপুর ২টোর মধ্যে শেষ করার জন্য ক্লাব ও বারোয়ারিগুলিকে বলা হয়েছে। প্রশাসনের আশা, সময় মেনে ঘট ভাসান সম্পন্ন হলে প্রতিমা নিরঞ্জনও দ্রুত শুরু করা সম্ভব হবে।
নিরাপত্তার দিক থেকেও থাকছে একাধিক ব্যবস্থা। শোভাযাত্রার পথে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা, ওয়াচ টাওয়ার ও ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি চালানো হবে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সতর্ক থাকবে প্রশাসন। জরুরি পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ ১১২ অথবা ১০০ নম্বরে ফোন করে প্রশাসনকে জানাতে পারবেন। অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী মঙ্গলঘট ভাসানকে সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করে প্রতিমা নিরঞ্জন পর্ব নির্বিঘ্নে শেষ করাই প্রশাসনের এবারের লক্ষ্য।
কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার এসপি অতুল ভি বলেন, কৃষ্ণনগর শহর জগদ্ধাত্রী পুজোর জন্য বিখ্যাত। আর সবাই দেখতে পারবে, অনেক কিছু নতুন হয়েছে। আমাদের সবার চেষ্টা থাকবে পুজোটা খুব সুন্দর ভাবে করার। জগদ্ধাত্রী পুজোর সময় সারা রাজ্য এবং দেশজুড়ে কৃষ্ণনগর এবং চন্দননগরের উপর চোখ থাকবে, সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকবে। আমাদেরও দেখাতে হবে পুজোটা খুব সুন্দর ভাবে শান্তিপূর্ণ ভাবে করা যায়। বিসর্জনের দিন সকালে এখানে যেটা হয় ঘট বিসর্জন, সকাল ১০টা থেকে শুরু করতে হবে, আরও আগে কেউ করতে চাইলে তারা করতেই পারে। কিন্তু আমাদের ২ টোর মধ্যে শেষ করতেই হবে। এটাই আমাদের লক্ষ্য।
কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর খ্যাতি সর্বজনবিদিত। কৃষ্ণনগরের একদিনই জগদ্ধাত্রী পুজো হয়ে থাকে। বিসর্জনের দিন সকালে হয় মঙ্গলঘট ভাসান। মঙ্গলঘট বিসর্জনে শোভাযাত্রা করে বারোয়ারিগুলি। তা দেখতে কৃষ্ণনগরের হাই স্ট্রিটে জনপ্লাবন নামে। এদিন দূর দুরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা খট বিসর্জনের শোভাযাত্রা দেখতে আসেন। প্রশাসনকেও ভিড় সামলাতে রীতিমত বেগ পেতে হয়।
কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী প্রতিমা নিরঞ্জনের সঙ্গেই ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে রয়েছে ঘট ভাসানের ইতিহাস। যা গোটা বাংলায় আর কোথাও সেভাবে দেখা যায়না। রাতের বেলা প্রতিমা নিরঞ্জনের বিশৃঙ্খলা থেকে বিরত থাকতেই ঘট ভাসান শুরু হয়েছিল। বর্তমানে বিসর্জনের দিনে দুপুরবেলা বিরাট আয়োজনে ঘট ভাসান ছাড়া প্রতিমা নিরঞ্জন অসম্পূর্ণ। কৃষ্ণনগরের গোলাপট্টি বারোয়ারি এই প্রথা চালু করে।
জানা যায়, আগে প্রতিমার সঙ্গেই ঘট বিসর্জন হতো। কিন্ত অশান্তির জন্য ১৯৯৪ সালে প্রতিমা নিরঞ্জনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল প্রশাসন। কিন্তু সেই বছর গোলাপটি বারোয়ারি এক কাণ্ড করে বসে। প্রতিমার বদলে দিনের বেলা শোভাযাত্রা করে ঘট নিয়ে ভাসানে বেরিয়ে পড়ে। শোভাযাত্রায় ফিরিয়ে আনা হয়েছিল বন্ধ হয়ে যাওয়া সঙকেও। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে, এই সঙ সাজতেন। সেই শুরু। কমিটির এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছিল প্রশাসনও। তারপর ধীরে ধীরে বাকি পুজো কমিটিরগুলোও দিনের বেলা ঘট ভাসান শুরু করে।
গোলাপট্টি বারোয়ারি সূত্রে জানা যায়, বহু বছর আগে ঝামেলার কারণে পুজো বন্ধ হয়ে যায়। তখন মানিক মোদক নামে এক ব্যক্তি ঘট পুজো করে তার ভাসান দেয়। পরর্বতীকালে ১৯৯৪ শান্তি লাহা ও গৌরি শঙ্কর দত্ত মিলে প্রথম মণ্ডপ সাজান। সেই থেকে শুরু।
জগদ্ধাত্রীর উৎস সন্ধানে গ্রন্থের লেখক সুপ্রতিম কর্মকার বলেন, শোভাযাত্রা কৃষ্ণনগরে রাজার আমল থেকেই হয়ে আসছে। আগে সং হিসাবে শোভাযাত্রা হতো, পরবর্তীতে সেটিই ঘট বিসর্জন হল।



