মানিয়ে নেওয়ার দিন শেষ! ডিভোর্স করাতে আইনজীবী খুঁজছেন নববধূরা, বিজ্ঞাপনে ছয়লাপ সোশ্যাল মিডিয়া
  • ৪ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: স্বামীর ঘরে মানিয়ে নেওয়ার দিন বোধহয় শেষ! সামান্য ঠোকাঠুকি হলেই বিবাহ বিচ্ছেদের পথে হাঁটছেন নববধূরা। দুই বাড়ির প্রবীণদের মধ্যস্থতার কোনো সুযোগই দেওয়া হচ্ছে না। অপেক্ষা করা হচ্ছে না বাবা-মায়ের মতামতের। সিদ্ধান্ত একেবারে ব্যক্তিগত। রীতিমতো সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘বিজ্ঞাপন’ দিয়ে দুঁদে আইনজীবী চাইছেন দ্রুত বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে। সাম্প্রতিক সময়ে জেন-জি নববধূদের মধ্যে এই ট্রেন্ড দেখে উদ্বিগ্ন সমাজ বিজ্ঞানীদের একটা বড় অংশ। তাঁদের মতে, বিবাহ বিচ্ছেদের একাধিক কারণ থাকে। তবে, ইদানীং সামান্য গোলমালেও ভেঙে যাচ্ছে সংসার। সে প্রেম করে বিয়ে হোক কিংবা দেখাশোনা করে—সবক্ষেত্রেই সংসার জীবন দীর্ঘায়িত করার গরজ দেখাচ্ছেন না কেউই। আসলে, বর্তমান সময়ে প্রেম-ভালোবাসার অনুভূতিটাই তরুণ প্রজন্মের কাছে ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে। আর অনুভূতি না থাকলে দায়বদ্ধতা আসে না। তাই, আজকাল টেকসই প্রেম হারিয়ে যাচ্ছে। প্রেম-পর্বে জলভাত হয়ে উঠছে ‘ব্রেক-আপ’ কথাটি। স্বাভাবিকভাবেই অনুভূতিহীন এই প্রেমের ছায়া পড়ছে সংসারজীবনেও। ফলে, বিয়ের দুই থেকে তিন কিংবা ছ’মাস অথবা খুব বড়জোড় হলে এক বছরের মধ্যেই স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ চাইছেন নববধূদের একটা বড় অংশ। তাতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন বাবা-মায়েরা। মুখ বুজে মেয়ের ইচ্ছেকে মেনে নেওয়া ছাড়া তাঁদের কাছে আর কোনো পথ খোলা থাকছে না। সবমিলিয়ে, নববধূদের ডিভোর্স নেওয়ার এমন ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত সমাজেও একটা গভীর সংকট তৈরি করছে বলে মত সমাজ বিজ্ঞানীদের। 

Advertisement

সহমত পোষণ করছেন আইনজীবীরাও। বর্ধমান আদালতের আইনজীবী অনীশ দাস বলছিলেন, ‘আমাদের সমাজে বিয়ে নামক রীতি অনেকটা আঁকশির মতো। সমাজকে সংঘবদ্ধ রাখতে সাহায্য করে। অথচ, ইদানীং  ছোট ছোট কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে যাচ্ছে। দু’পক্ষের মধ্যেই ধৈর্যের অভাব দেখা যাচ্ছে। অনেকের বিয়ে হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে। আবার বিচ্ছেদও ঘোষণা করছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এসব কিন্তু সমাজের কাছে খুব ভালো বার্তা নয়।’ 
সোশ্যাল মিডিয়ার কয়েকটি প্ল্যাটফর্মে চোখ রাখলে নজরে পড়বে চমকে দেওয়ার মতো নববধূদের প্রস্তাব। একজন লিখেছেন—‘ডিভোর্সের জন্য ভাল উকিলের সন্ধান চাই। মিউচুয়াল ডিভোর্স ফাইল করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও কিছু সমস্যা হয়েছে। সেই কারণে ভাল উকিলপ্রয়োজন।’ আর এক গৃহবধূ বিজ্ঞাপনে লিখেছেন, ‘তিন বছর সংসার করার পর আর পারা যাচ্ছে না। অনেক কিছু মুখ বুজে মেনে নিয়েছিলাম। এবার বিচ্ছেদ চাই। কারও পরিচিত ডিভোর্স বিশেষজ্ঞ ভাল উকিল থাকলে নম্বর দিন।’
অধ্যাপক দিব্যেন্দু সাহা কথায় কথায় বলছিলেন, ‘সংসারে সমস্যা থাকতেই পারে। সেটা আলোচনা করে মেটানো যেতেই পারে। কিন্তু এমন হঠকারী সিদ্ধান্তে বিচ্ছেদ কাম্য নয়। আগে ডিভোর্স হয়নি, এমনটা নয়। কিন্তু এখন সেই প্রবণতা অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। তার চেয়েও বড় কথা, বধূরা ডিভোর্স চাইছেন লুকোছাপা না করেই।’ এক আইনজীবীর কথায়, ‘আগের দিনে সংসারে অশান্তি হলে মেয়েরা বাড়ির লোকজনদের বলত। দুই বাড়ির লোকেরা আলোচনা করে সমস্যা মেটানোর চেষ্টা করতেন। এখন সব ঠিক করে দিচ্ছে সমাজমাধ্যম। সেখানে মিলছে বন্ধুর খোঁজ। মিলছে বিচ্ছেদের পরামর্শও। পরে সেই বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন। অনেকক্ষেত্রে বিচ্ছেদের যৌক্তিকতাও থাকে। মিথ্যা তথ্য দিয়ে অনেকে বিয়ে করেন। তখন ডিভোর্স ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।’