বলরাম দত্তবণিক, রামপুরহাট: তারাপীঠের মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড ও হোটেল দুর্ঘটনার পর ফের প্রকাশ্যে পর্যটন ও পরিষেবা শিল্পের কঙ্কালসার চেহারা। গত সোমবার ভোরে এখানকার একটি লজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুই শিশু সহ ন’জনের মৃত্যু হয়। তদন্তে নেমে পুলিশ ও প্রশাসন জানতে পেরেছে, লজটির ‘সরাই লাইসেন্স’ই ছিল না। তা সত্ত্বেও দীর্ঘ ২০ বছর ব্যবসা করে এসেছে।
তারাপীঠ মন্দিরকে ঘিরে বছরের পর বছর ধরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে গজিয়ে উঠেছে বহু লজ, হোটেল ও গেস্ট হাউস। স্থানীয় সূত্রে খবর, বর্তমানে এই সংখ্যা চারশো ছাড়িয়ে গিয়েছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে একটি লজের গা ঘেঁসে অপর একটি লজ তৈরি করা হয়েছে। অলিগলির সংকীর্ণ রাস্তার দুই পাশে যেভাবে বহুতল একাধিক হোটেল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাতে কোনো অগ্নিকাণ্ড ঘটলে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি ঢোকার জো নেই।
১৮৬৭ সালের ‘সরাই আইন’ অনুযায়ী পর্যটকদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন বা ‘শিল্প সাথী’ পোর্টালের মাধ্যমে সরাই লাইসেন্স প্রদানের ব্যবস্থা করে। ট্রেড লাইসেন্স বা ফায়ার সেফটি লাইসেন্সের মতোই হোটেল ও লজ পরিচালনার জন্য এই লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। তবে, তারাপীঠের অধিকাংশ হোটেল মালিক বছরের পর বছর এই নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছেন।
অভিশপ্ত হোটেলটির নির্মাণ খতিয়ে দেখে প্রশাসন জানতে পেরেছে, এটি ২০০৬ সালে নির্মিত হয়েছিল। তৎকালীন জেলা পরিষদ থেকে বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদন করা হয়েছিল। টিআরডিএ সূত্রে জানানো হয়েছে, ২০২৩ সালে প্ল্যান পাশের অনুমতির প্রক্রিয়া শুরু হলেও তার আগেই অধিকাংশ হোটেল তৈরি হয়ে গিয়েছিল। টিআরডিএ এপর্যন্ত নিয়ম মেনে মাত্র ২৫টি লজ নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে।
মহকুমাশাসক অশ্বিন বি রাঠোর জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাগ্রস্ত হোটেলটির কোনো সরাই লাইসেন্স ছিল না। যদিও সেখানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র বসানো ছিল। কিন্তু জরুরি মুহূর্তে সেগুলি সম্পূর্ণ অকেজো অবস্থায় পাওয়া যায়।
এদিকে ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার পর টনক নড়েছে জেলা প্রশাসনের। অবৈধ ও বিপজ্জনক হোটেলগুলির বিরুদ্ধে তড়িঘড়ি ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার নিয়ম বহির্ভূতভাবে পরিচালিত ১৫টি হোটেল অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য নির্দেশ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। এদিন মহকুমাশাসক আরও ৯টি হোটেলের মালিককে নোটিস পাঠিয়ে সরাসরি শুনানিতে তলব করেছে। জানা গিয়েছে, এর আগে ২৮ জুলাই নোটিস পাঠিয়ে বিল্ডিং প্ল্যান, জমির মিউটেশন, ফায়ার সেফটি সার্টিফিকেট ইত্যাদি জমা দিতে বলা হলেও এই হোটেলগুলির মালিকরা তা দাখিল করেনি। ফলে, কেন তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে না, তা জানতে শোকজ করা হয়েছে।
স্থানীয়রা বলেন, প্রতিদিন হাজার হাজার পুণ্যার্থী ও পর্যটক তারাপীঠে আসেন। বিশেষ তিথিগুলিতে ভিড় বহুগুণ বেড়ে যায়। হাজার হাজার পর্যটকের জীবন বিপন্ন করে কীভাবে বছরের পর বছর প্রশাসনিক নজর এড়িয়ে এই অবৈধ কারবার চলছিল? তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটলেই প্রশাসনের দৌড়ঝাঁপ চোখে পড়ে। কিছুদিন কাটলেই পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। তাই শুধু সাময়িক নোটিস নয়, অবিলম্বে সমস্ত অবৈধ হোটেলের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সকলেই।