বিশ্বজিৎ মাইতি, বরানগর: দেশের প্রথম বাণিজ্যিক ভ্যাকসিন তৈরির কেন্দ্র এখন সাপের আঁতুড়ঘর। জঙ্গলে পরিপূর্ণ বিঘার পর বিঘা জমি এখন শিয়ালের নিশ্চিন্ত আস্তানা। কলকাতার উপকণ্ঠে সিঁথির মোড় ও এ কে মুখার্জি রোডের ‘বেঙ্গল ইমিউনিটি’ কারখানা এক সময় ছিল অবিভক্ত বাংলা তথা গোটা দেশের বড়ো ভরসার জায়গা। নয়ের দশকে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া এই কারখানার জমিতে নতুন শিল্প চাইছে বরানগরবাসী। এলাকার প্রাক্তন বিধায়ক এখন রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী। তাই ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারকে ঘিরে প্রত্যাশার পারদ চড়ছে বরানগরে। ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকার এই বিশাল জমিতে দ্রুত নতুন উদ্যোগ শুরু হবে বলে আশাবাদী শহরবাসী।
১৯১৯ সাল। সাপ ও কুকুরের কামড়ে তখন শয়ে শয়ে বঙ্গবাসীর প্রাণ যেত। সেই সময় ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়, নীলরতন সরকারের মতো প্রথিতযশা চিকিৎসকদের হাত ধরে তৈরি হয়েছিল ‘বেঙ্গল ইমিউনিটি’। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সেই সংস্থা ব্যবসায়িকভাবে অলাভজনক হয়ে পড়ে। ওই অবস্থায় ১৯২৫ সালে ‘বেঙ্গল ইমিউনিটি’-র দায়িত্ব বিশিষ্ট চিকিৎসক নরেন্দ্রনাথ দত্তের হাতে অর্পণ করেন বিধানবাবু। সেই নরেন্দ্রনাথ দত্তের হাত ধরেই মহীরুহ হয়ে ওঠে এই সংস্থা। পরাধীন ভারতে সাপ, কুকুর কামড়ানোর ভ্যাকসিন ছাড়াও তৈরি হতে শুরু করে নানা জীবনদায়ী ওষুধ। সিঁথির মোড় লাগোয়া গোপাললাল ঠাকুর রোডের উপর প্রায় ৮০ বিঘা জায়গার উপর এসব জীবনদায়ী ভ্যাকসিন ও ওষুধ তৈরি হত। এ কে মুখার্জি রোডের ন’পাড়া এলাকায় প্রায় ২১ বিঘা জমিতে ছিল ঘোড়ার আস্তাবল। ঘোড়ার রক্ত সংগ্রহ করে তা থেকে তৈরি হত সাপে কাটার প্রতিষেধক সিরাম। ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এই কারখানার জাতীয়করণ হয়। কিন্তু ১৯৯০ সালে ঘোড়ার রক্ত ব্যবহার করে সিরাম তৈরিতে বিধিনিষেধ আরোপ হওয়ায় ধুঁকতে থাকা কারখানা বন্ধ হয়ে যায় অচিরেই। এখন দু’টি বিশাল জায়গা জঙ্গলে ভরে গিয়েছে। মশা, সাপ ও শিয়ালের আঁতুড়ঘর। গত দু’দশকে কারখানার গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী, ইট ও কাঠামো চুরি করেছে দুষ্কৃতীরা। শহরের মধ্যে কার্যত অব্যবহৃত অবস্থায় জঙ্গল হয়ে পড়ে রয়েছে বিশাল এই জমি।
বরানগরের বাসিন্দা কৌস্তভ দত্ত, তীর্থঙ্কর দাঁ বলেন, ‘এখন তো এই জমিতে ভারী শিল্প হওয়া সম্ভব নয়। চারদিকে আবাসন ও জনবসতি। তবে ওই জমিতে তথ্যপ্রযুক্তি পার্ক, চিপ তৈরির কারখানা বা দূষণহীন শিল্পস্থাপন সম্ভব। বরানগরের প্রাক্তন বিধায়ক তাপস রায় তো এখন শিল্পমন্ত্রী। ডবল ইঞ্জিন সরকারের কাছে এটাই প্রত্যাশা যে এখানে শিল্প ও কর্মসংস্থান হবে।’ বরানগরের বর্ষীয়ান তৃণমূল নেতা তথা পুরসভার সিআইসি রামকৃষ্ণ পাল বলেন, ‘বেঙ্গল ইমিউনিটি খোলানোর জন্য বহুবার দিল্লি গিয়ে ব্যর্থ হয়েছি। নতুন সরকার এই জমিতে শিল্প আনলে খুব খুশি হব। নতুন সরকারের কাছে আবেদন, বরানগরে গত ২০ বছরে কারা এখানে শিল্পের জমিতে আবাসন গড়ল, কত সরকারি জায়গা দখল হল, তা তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’ বিধায়ক সজল ঘোষ বলেন, ‘বেকারদের কর্মসংস্থান দেওয়া আমাদের চ্যালেঞ্জ। বরানগরে বেঙ্গল ইমিউনিটি ও আরআইসি বাজারের বিপুল সরকারি জমি পড়ে রয়েছে। শিল্পমন্ত্রীর সঙ্গে আমার এনিয়ে কথা হয়েছে। আগামী দিনে ওই জমিতে নতুন উদ্যোগ নিয়ে আমরা আশাবাদী।’