


তন্ময় মল্লিক বাঁকুড়া: নির্বাচন ঘোষণার আগেই লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ভাতা ৫০০ টাকা বেড়েছে। চালু হয়েছে যুবসাথী প্রকল্প। লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতীর অ্যাকাউন্টে ঢুকেছে দেড় হাজার টাকা। তাতেই বিরোধীরা সিঁদুরে মেঘ দেখছে। তারা মনে করছে, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো যুবসাথীর জন্য বেকারদের একটা বড়ো অংশের সমর্থন তৃণমূলের দিকে যাবে। তাই তৃণমূল যখন সামাজিক প্রকল্প নিয়ে প্রচার করছে, বিরোধীরা তখন সরব ‘ভাতা রাজনীতি’র বিরুদ্ধে। মোট কথা, এবারের নির্বাচনের ‘এক্স ফ্যাক্টর’ ভাতা।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বাংলার ভোট রাজনীতির সমীকরণ বদলে দিয়েছে। এবারের নির্বাচনে তার প্রভাব আরও বেশি পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ভাতা বৃদ্ধি গ্রামবাংলার মহিলাদের উপর কেমন প্রভাব ফেলেছে, তা শোনা যাক বাঁকুড়া জেলার বেলিয়াতোড় এলাকার বাসিন্দাদের মুখে।
বেলিয়াতোড়ের বনগ্রামে পিচ রাস্তার ধারে চায়ের দোকানে বসেছে সান্ধ্যকালীন আড্ডা। মাঝবয়সিদের ভিড়ই বেশি। ভোটের প্রসঙ্গ তোলায় কেউ বললেন, ‘১৫ বছর তো হল। এবার পালটানো দরকার।’ কেউ বললেন, ‘শান্তিতে আছি। এই বেশ ভালো।’ বোঝা গেল, সব দলের সমর্থকই রয়েছেন। তাতে হাওয়া বোঝা কঠিন। কিন্তু লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের প্রসঙ্গ তুলতেই বদলে গেল পরিস্থিতি। সকলে একমত, ‘বেশিরভাগ মহিলার ভোট তৃণমূলের দিকেই।’ একজন বললেন, ‘আরে মশাই, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের জন্য সংসারের কী পরিস্থিতি শুনবেন? ফোন এলেই গিন্নি রান্না ফেলে হাতে খুন্তি ধরিয়ে বলে দিচ্ছে, তুমি বাকিটা করে নাও। আমার মিটিং আছে, আমি চললাম।’
আড্ডায় হাসির রোল। একজন বলল, ‘একদম ঠিক কথা বলেছ কাকা। বাড়ির বউরা আর আমাদের কথা শুনে ভোট দেয় না। আগের মতো কোনো পরিবারই তৃণমূল, বিজেপি বা সিপিএমের খাঁটি সমর্থক নয়। এখন মিলিজুলি রাজনীতির সংসার।’
তমলুক মেডিকেল কলেজের আউটডোরের বাইরে টোটো চালকের সিটে বসেছিলেন নন্দকুমার থানার ভবানীপুরের নগেন্দ্র কুমার। তিনি দিল্লিতে থাকতেন। বিয়ে করে এখন এখানেই থাকেন। টোটো চালান। তাঁর মত, ‘এবার পালটানো দরকার।’ সঙ্গে সঙ্গে পিছনে বসা মহিলার প্রতিবাদ, ‘কেন দিদি তোমার মেয়ের বিয়েতে টাকা দেয়নি? লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা সংসারের কাজে লাগে না? তাহলে বদলে কী হবে?’ মহিলা যাত্রীর এমন স্বতঃপ্রণোদিত প্রতিবাদে বিস্ময় জাগে। মহিলা নিজেই বললেন, ‘আমার নাম মঞ্জুদেবী। উনি আমার স্বামী। তাই প্রতিবাদ করলাম।’ বুঝলাম, বেলিয়াতোড়ের ভদ্রলোক হক কথা বলেছেন, ‘গ্রামে এখন মিলিজুলি রাজনীতির সংসার।’
আদ্রা স্টেশনের বাইরে পানের গুমটির সামনে দাঁড়িয়েছিলেন অর্ণব বাউড়ি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক। চাকরি পাননি। গাড়ির ব্যবসা করেন। ভোটের হাওয়া কোন দিকে? অর্ণবের উত্তর, ‘মানুষ যার কাছ থেকে পাবে, তাকেই ভোট দেবে। এই ধরুন, আমাদের সংসারে এতদিন মা ও স্ত্রী মাসে ৩ হাজার টাকা পেত। এবার আমি যুবসাথীর টাকা পেয়েছি। চার, পাঁচজনের সংসার হলেই নানান প্রকল্পে বছরে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা ঢুকছে। কম কী মশাই?’ কিন্তু বিরোধীরা তো বলছে, ভাতা দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেকারদের পঙ্গু করে দিচ্ছে?
উত্তর দিলেন পাশে দাঁড়ানো এক যুবক। বললেন, ‘লক্ষাধিক টাকা বেতন পাওয়া সরকারি কর্মীদের ডিএ আন্দোলনকে বিরোধীরা সমর্থন করতে পারে। কিন্তু আমরা ভাতা পেলেই ওদের জ্বালা? আরে বাবা, দুটোই তো ভাতা। ওদের ভাতা বাড়লে ব্যাংকে টাকা বাড়ে। আর আমাদের ভাতায় চলে সংসার। ভাতা প্রান্তিক মানুষের কাছে লাইফ-লাইন, এটা রাজনীতির কারবারিরা কবে বুঝবে?’