নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: মেসির পরাজয়ে আর্জেন্তিনা যত না বিমর্ষ তার থেকে বোধহয় বেশি মুষড়ে পড়েছে কলকাতা। দক্ষিণের পর্ণশ্রী থেকে উত্তরের আমহার্স্ট স্ট্রিট, কোথাও মাংসের হাঁড়ি চড়ল না, কোথাও সোমবারের আগাম ছুটি ক্যানসেল করে ভাত না খেয়েই অফিস চলে গেল অনেকে। দিনভর অফিস-কাছারি-কলেজ-স্কুল, চায়ের দোকানে-শপিং মলে আক্ষেপ, ‘হারা জেতা তো থাকবেই, কিন্তু এভাবে আত্মসমর্পণ!’ তবে হারলেও গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম (গোট) লিও মেসির আসন স্থানচ্যূত হল না মোটেও। বাঙালির হৃদয়ে ভগবানের আসনেই দস্তুরমতো রয়ে গেলেন। কলকাতায় বিশ্বকাপ পরবর্তী আলোচনা তাঁকে ঘিরেই। আক্ষেপ, দুঃখ, স্বপ্নভঙ্গ আর অতীত সোমবার দিনভর আচ্ছন্ন করে রাখল ফুটবলের মক্কাকে।
বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষ হয়েছে রবিবার মাঝরাতে। তারপর সোমবার কলকাতা ঘুরে দেখা গিয়েছে, গোটা শহর যেন নিকট আত্মীয় বিয়োগের শোকে মুহ্যমান। শহর এখনও নীল-সাদা রঙের সঙ্গে আত্মীয়তা বজায় রেখেছে। বিশ্বকাপে আর্জেন্তিনার ট্র্যাক রেকর্ড বলছে, শেষ মুহূর্তে ঝলসে উঠছেন মেসি। পর্ণশ্রীর চিরঞ্জিত মারিকরা উত্তেজনায় টগবগ করছেন। পাড়ার মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে বসেছিলেন বিরাট স্ক্রিনের সামনে। আকাশে আর্জেন্তিনার পতাকা, সর্বকালের সেরার কাটআউট বাতাসে দুলছে। কিন্তু ১২০ মিনিটে একবারও ঝলসালো না এলএম টেনের বুট। জীবন যেন মিথ্যে হয়ে গেল চিরঞ্জিতদের। চোখে জল। মুখ শুকিয়ে গিয়েছে। রাতে রান্না করা রুটি-মাংস পড়েই রইল। বাড়ি চলে গেলেন সকলে।
এ যদি হয় দক্ষিণ তো উত্তর কলকাতার কি কম মন খারাপ? উৎসব করবেন বলে সোমবার অনেকেই আগাম অফিস ছুটি নিয়ে রেখেছিলেন। শ্রদ্ধানন্দ পার্ক এলাকার অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়রা মেসি জিতছেই ভেবে পাঁঠার মাংস কিনেছিলেন। সোমবার সকাল থেকে শুরু হত সেলিব্রেশন। কিন্তু সেলিব্রেশনে জল ঢালল স্পেনের ফরোয়ার্ড ফেরান তোরেসের ভলি। ১০৬ মিনিটেই কার্যত নিশ্চিত স্পেনের জয়। ছুটি বাতিল করে অরূপরা সোমবার চলে গেলেন অফিস। মাংস পড়ে রইল, রান্না করার গরজ কারও নেই।
সোমবার বেহালা থেকে সোদপুর, সল্টলেক থেকে শ্যামবাজার, সব পাড়ায় রাতের চেয়ারগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। খেলা দেখার জন্য ভাড়া করা স্ক্রিন বা এলইডি খুলছে ডেকরেটর্স। মনে হচ্ছে যেন আজ দশমী। দুর্গা বিদায় নিচ্ছেন তাই বিষাদে ভেঙে পড়েছে শহর। সকলেরই চোখমুখ কালো। ভরা বর্ষায় অকাল দশমীর আকাশও এদিন কালো। দুপুরের তুমুল বৃষ্টি যেন সকলের চোখের জল হয়ে ভাসিয়ে দিল শহর।
২০২২ সালে এই পাড়াগুলিই হয়ে উঠেছিলে মেসির জন্মভূমি রোজারিও’র মতো। কিন্তু ৪ বছর পর সেই ফাইনালেই মেসির বিদায় মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। ‘হারটা যেন ঠিক হারের মতো হল না, লড়াইহীন আত্মসমর্পণ।’ আড়াই দশক ধরে ফুটবলকে স্বপ্নে মুড়ে রেখে দিয়েছিলেন যে মেসি, আচমকা ঘুম ভাঙল বলে সে স্বপ্ন শেষ হল না। তবু ঠাকুরপুকুরের ২৮ বছরের অরনা সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখলেন—‘কভি আলবিদা না কহে না...’