শ্রীকান্ত পড়্যা, তমলুক: স্বাধীনতা আন্দোলন ছাড়াও কালীপুজো ঘিরে রাজ্যব্যাপী তমলুকের পরিচিতি রয়েছে। প্রাচীন তাম্রলিপ্ত তথা তমলুক শহরে রয়েছে একান্ন সতীপীঠের অন্যতম দেবী বর্গভীমা। তাঁর মাহাত্ম্য ও শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত এই শহরের কালীপুজো। মায়ের কাছে পুজোর ‘অনুমতি’ নেওয়ার বিশেষ নিয়ম এই শহরের আরও এক চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য। ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র অন্দোলনের সময় থেকেই তমলুক শহরে কালী আরাধনার ইতিহাস এক অনন্য মাত্রা পায়। বর্তমানে তমলুক শহরের সবুজপাতা, উত্তরায়ণ, রিভারপ্লেট, অমরসংঘ, হরির বাজার অ্যাথলেটিক ক্লাব, ফ্রেন্ডস ক্লাব, বিদ্রোহী সংঘ এবং ফাইভস্টারের থিম ও আলোর লড়াই ঐতিহ্যবাহী কালীপুজোকে এক আধুনিক উৎসবের রূপ দিয়েছে।
নিম্নচাপের জেরে ঘনঘন বৃষ্টি এবং দুর্যোগ এবার মণ্ডপ তৈরির কাজে বাধা সৃষ্টি করছে। থিম কারিগররা কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়েই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সুসজ্জিত মণ্ডপ তৈরির কাজে শামিল হয়েছেন। ২০টির বেশি থিমের মণ্ডপ ঘিরে কার্তিক মাসের অমাবস্যার নিশিতে আলোর রোশনাইয়ে ভেসে ওঠে শহর তমলুক। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম ঘটে। চার-পাঁচদিন ধরে উৎসব অনুষ্ঠান চলে। সঙ্গে মেলা বসে। অন্য জেলা থেকে হাজার হাজার দর্শনার্থী তমলুক শহরে আসেন।
তমলুক শহরের বিগ বাজেটের কালীপুজোর মধ্যে প্রথমসারিতে রয়েছে বাদামতলার উত্তরায়ণ। এবার তাদের থিম এলিয়েন। ভিনগ্রহ নিয়ে পৃথিবীব্যাপী আগ্রহ কম নয়। মহাকাশ বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে গ্রহে, উপগ্রহ রকেট পাঠানো চলছে। পৃথিবীর বাইরে মহাবিশ্বে অন্য কোথাও বসবাসকারীদের কাল্পনিক প্রাণিদের ভাবনা থেকেই এই থিম। ১৫নম্বর ওয়ার্ডে রাজদূত ক্লাব এবার হারিয়ে যাওয়া ডোকরা শিল্পকে থিমে উপস্থাপন করেছে। চারদিন ধরে নানা অনুষ্ঠান রয়েছে বলে ক্লাবকর্তা অমিত দাস জানিয়েছেন।
১৮নম্বর ওয়ার্ডে রিভারপ্লেট ক্লাব এবার বলিউড তারকা নানা পাটেকরকে নিজেদের থিমে তুলে ধরছে। সম্প্রতি তাঁর জীবনাবসান হয়েছে। রূপোলি পর্দায় তাঁর অভিনয়ের নানা মুহূর্ত তুলে ধরা হচ্ছে। তমলুকের রাখাল মেমোরিয়াল গ্রাউন্ডে কিশোর সংঘ মোমবাতি, হ্যারিকেন ও লম্ফের আলোয় বই পড়ার সেই অতীতের স্মৃতিকে থিমে উপস্থাপন করছে। একসময় গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। মোমবাতি, হ্যারিকেন ও লম্ফের আলোই ছিল ভরসা। সেই আলোয় পড়াশোনা করতে অভ্যস্ত ছিল কচিকাঁচারা। অথচ, আজকের প্রজন্ম মোবাইলে বুঁদ হয়ে থাকছে। এই বিষয়টিতে থিমে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে ক্লাব সভাপতি বাচ্চু সামন্ত জানান। শহরের ১৫নম্বর ওয়ার্ডে বাদামতলার ফ্রেন্ডস ক্লাবের থিম গোধুলিবেলায় মায়ের আরধানায় কল্পনায় আলপনা। মণ্ডপজুড়ে একটা আলোআঁধারি পরিবেশ থাকছে। আঁধার শেষে নেমে আসছে আলো। আকাশ থেকে নেমে আসছে আলপনা। এরকম একটা চিত্রকে মণ্ডপে তুলে ধরছেন মণ্ডপশিল্পীরা। শহরের হাসপাতাল মোড়ে বিদ্রোহী সংঘের থিম-সুখের স্বর্গ বিদ্রোহীতে। শহরের একেবারে প্রাণকেন্দ্র হাসপাতাল মোড়ে এই ক্লাবের পুজো মণ্ডপে মেলার মতো ভিড় হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে উদ্যোক্তারা মনে করছেন।
শহরের শালগেছিয়ায় অমরসংঘের থিম-পরিবর্তন। আদিম জাতিগোষ্ঠী থেকে আজকে উন্নত সভ্যতার বিবর্তনের ইতিহাসকে থিমে উপস্থাপন করা হচ্ছে। জারোয়া জাতিগোষ্ঠীকে থিমে তুলে ধরা হবে। তমলুক শহরে ১০নম্বর ওয়ার্ডে পদুমবসানে রাজ্য সড়কের ধারে সিম্ফনী ক্লাবের থিম ‘অর্ধজীবন’। সভ্যতার অতীত ও বর্তমানের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠেছে এখানকার থিম। কলেজপাড়ায় ভাই ভাই সংঘের থিম-নেশা নয়, নিঃশ্বাস চাই। সুপারি দিয়ে মণ্ডপ ও প্রতিমা তৈরি হচ্ছে। হরিরবাজার অ্যাথলেটিক ক্লাবের পুজো এবার ৭৫বছরে পা দিল। থিম-চক্রই মানুষের জীবনের চক্র। মণ্ডপ তৈরি হবে সুতো দিয়ে। উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, মানুষমাত্রই চক্রে বাঁধা। ব্রহ্মা সৃষ্টির শক্তি। সেখান থেকে নতুন জীবনের শুরু। বিষ্ণু পালনের শক্তি। জীবনকে রক্ষা করেন। শিব সংহারের শক্তি। পুরাতনকে ধ্বংস করে নতুনকে জায়গা করে দেন। এভাবেই থিম তুলে ধরা হয়েছে।
তমলুক শহরের সর্ববৃহৎ বাজেটের পুজো করত হাসপাতাল মোড়ের ফাইভস্টার ক্লাব। মুম্বই ও কলকাতার নামী শিল্পীরা ছ’দিনব্যাপী মঞ্চ মাতাতেন। তৃণমূল কংগ্রেস চঞ্চল খাঁড়া ছিলেন ক্লাব সভাপতি। পালাবদলের পর তিনি গ্রেপ্তার হন। তারপর পুজো ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এবার পুজো করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। তবে, জমকালো নয়, অত্যন্ত সাদামাটাভাবেই পুজো হবে।



