নিজস্ব প্রতিনিধি, বহরমপুর ও সংবাদদাতা, জঙ্গিপুর: বিজেপি শাসিত রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া এখন বাংলার শ্রমিকদের কাছে রীতিমতো আতঙ্কের বিষয়। ওড়িশা, ছত্তিশগড় থেকে অসম—সর্বত্র বাঙালিদের উপর লাগাতার আক্রমণ। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই নিয়ে কড়া ভাষায় প্রতিবাদ জানালেও ডবল ইঞ্জিন রাজ্যে বর্বরতার ঘটনা কমছে না। শুক্রবার বাঙালি বিদ্বেষের সেই তালিকায় জুড়ল মুর্শিদাবাদের আরও দুই বাসিন্দার নাম। সাগরদিঘির কাবিলপুরের বাসিন্দা ইয়াদুল শেখ ও রঘুনাথগঞ্জের সন্মতিনগরের বিকাশ রবিদাস। ছত্তিশগড় ও ওড়িশায় বিজেপি আশ্রিত দুষ্কৃতীদের হাতে মার খেয়ে প্রাণ ভয়ে বাড়ি ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন দু’জনেই। দিন কয়েক আগে সূতির পরিযায়ী শ্রমিক জুয়েল রানাকে (২১) পিটিয়ে খুন করা হয়েছে ওড়িশায়। সেই ঘটনা মাথায় রেখে ইয়াদুল ও বিকাশও আর ভিনরাজ্যে থাকার সাহস পাননি। বাড়ি ফিরে তাঁরা যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছেন, তাতে শিউরে উঠেছে এলাকাবাসী।
ছত্তিশগড়ের নারায়ণপুর এলাকায় ঘুরে ঘুরে শীতের পোশাক বিক্রি করেন ইয়াদুল শেখ। এটাই বিক্রির মরশুম। এক সপ্তাহ আগে তিনি মানিকপুরে সীমানাবর্তী গ্রামে ঘুরছিলেন। তখন ৫০-৬০ যুবক তাঁকে ঘিরে ধরে ‘বাংলাদেশি’ বলে দাগিয়ে দেয়। তারপর লোহার পাইপ দিয়ে বেধড়ক মারধর করে। কোনওরকমে দুষ্কৃতীদের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে তিনি পালিয়ে আসেন। গত বুধবার ফিরেছেন গ্রামের বাড়িতে। এদিন ইয়াদুল বলেন, ‘ওরা মারধর করতে করতেই ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে আমায় বাধ্য করে। বাঁচানোর জন্য চিৎকার করলেও কেউ এগিয়ে আসেনি। আমরা তো শ্রমিক, কাজ করে খাই। এভাবে পেটে লাথি মারলে আমরা কোথায় যাব? কী করে সংসার চালাব?’
শুধু সংখ্যালঘুরা নন, হিন্দুরাও বিজেপি শাসিত রাজ্যে হামলার শিকার হচ্ছেন। তার জ্বলন্ত উদাহরণ রঘুনাথগঞ্জের বিকাশ রবিদাস। রাজমিস্ত্রির কাজ করতে এক মাস আগে ওড়িশায় গিয়েছিলেন। দিন তিনেক আগে কয়েকজন দুষ্কৃতী তাঁকে ঘিরে ধরে। বাংলায় কথা বলায় ‘বাংলাদেশি’ বলে দাগিয়ে দেয়। আধার কার্ড আছে, একথা জানানোর পরেও রেহাই মেলেনি। তাঁকে বেধড়ক পিটিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। বাধ্য হয়ে তিনি পালিয়ে আসেন। রবিদাস এদিন বলেন, ‘যারা হামলা করছিল, তাদের কপালে তিলক ছিল। আমার দুই সহকর্মীকে মেরে মাথা ফাটিয়ে দেয়। হাত-পা ভেঙে দেয়। ওদের একজনের বাড়ি বেলডাঙায়, আর একজনের বাড়ি সূতিতে।’ বৃহস্পতিবার বাড়ি ফিরেই সন্ধ্যায় রঘুনাথগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন বিকাশ।
এপ্রসঙ্গে জঙ্গিপুর সাংগঠনিক জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি তথা সাংসদ খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমরা আক্রান্ত শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তাদের সব রকমভাবে সাহায্য করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী এ ব্যাপারে কড়া প্রতিক্রিয়া আগেই জানিয়েছেন।’ কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ভিন রাজ্যের ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রতিবাদ জানানোর উদ্যোগ নিয়েছেন দলের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য অধীররঞ্জন চৌধুরী। রবিবার তিনি যাচ্ছেন ওড়িশার সম্বলপুরের সোনাপল্লিতে। সেখানেই পিটিয়ে মারা হয়েছিল জুয়েল রানাকে।