তারক চক্রবর্তী, জলপাইগুড়ি: বলিপ্রথা এখনও রয়েছে জলপাইগুড়ির গোশালা মোড়ের ঐতিহাসিক দেবী চৌধুরানী কালীমন্দিরে। তবে এই মন্দিরেই একবার নরবলি দেওয়ায় পুরোহিত নয়ন কাপালিকের প্রাণদণ্ডের হুকুম দিয়েছিল তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার। সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমি সহ এমনই একাধিক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী প্রায় ২৭০ বছরের পুরনো দেবী চৌধুরানী কালী মন্দির। কালের নিয়মে একাধিক পুরনো অংশ নষ্ট হয়ে গেলেও এখনও রয়েছে ৩০০ বছরের পুরনো বটগাছ, প্রাচীন বেদি। প্রতি বছরের মতো এবছরও কালীপুজোর প্রস্তুতি শুরু করেছেন মন্দিরের ট্রাস্টের সদস্যরা।
এই শ্মশানকালী মন্দিরে মাকে শোল ও বোয়াল মাছের ভোগ দেওয়া হয়। দেবী চৌধুরানী নিজেও শোল মাছ পছন্দ করতেন। তিস্তা নদীর বোয়াল মাছও ছিল তাঁর প্রিয়। দেবী চৌধুরানীর পছন্দের সেই শোল, বোয়াল মাছ দিয়েই মাকে ভোগ নিবেদন করা হয়। তবে আশেপাশের চা বাগানের আদিবাসীরা যার যা মন চায় তাই মাকে নিবেদন করতে পারেন। কেউ দই, চিঁড়ে আবার কেউ ডাব দেন। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপধ্যায়ের উপন্যাসে দেবী চৌধুরানী ও ভবানী পাঠকের উল্লেখ রয়েছে। মন্দিরের প্রথম পুরোহিত ছিলেন ভবানী পাঠক। তাঁর পরে পুরোহিতের তালিকায় নাম আছে নয়ন কাপালিকের।
জানা গিয়েছে, ১৮৯০ সালে নরবলি দেওয়ার অভিযোগে নয়ন কাপালিকের প্রাণদণ্ড হয়। তারপর থেকেই এই মন্দিরে বন্ধ হয়ে যায় নরবলি প্রথা। তবে দীপান্বিতা কালীপুজোর রাতে আজও পাঁঠা বলি হয়। মন্দিরে ঢুকতেই প্রাচীন বট-পাকুড় গাছ দেখা যায়। নিস্তব্ধতায় ঘেরা চারপাশ। দিনের আলোতেও গা ছমছমে পরিবেশ রয়েছে চারদিকে। মন্দিরের পাশেই রয়েছে একটি পুকুর।
কথিত আছে পাশের নদীতে বজরা বেয়ে দেবী চৌধুরানী দলবল নিয়ে এই মন্দিরে আসতেন। মন্দিরে শ্মশান কালী মায়ের পুজো দিয়ে অভিযানে বের হতেন। সঙ্গী ছিলেন ভবানী পাঠক। বিস্তীর্ণ অঞ্চলে জমিদারদের ত্রাস হয়ে উঠেছিলেন এই দুই ঐতিহাসিক চরিত্র। দেবী চৌধুরানীর নির্দেশেই এখানে দেবীস্থান তৈরি হয়েছিল। যেখানে মাতৃপুজোয় মেতে উঠতেন দেবী চৌধুরানী ও তাঁর দলবল।
২৫ বছর ধরে এই মন্দিরের পুরোহিতের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন সুভাষ চৌধুরী। তিনি বলেন, মন্দিরে নিত্যপুজো হয়। তবে কার্তিকী অমাবস্যায় কালীপুজোর রাতে বিশেষ পুজো হয়। ডাল, ভাত, তরকারি সহ পাঁচ রকমের ভাজার পাশাপাশি শোল, বোয়াল মাছের ভোগ দেওয়া হয় মাকে। নানান উপাচারের মাধ্যমে রাত ১০টা থেকে পুজো শুরু হয়ে ভোর ৪টা পর্যন্ত চলে।



