সুমন তেওয়ারি, (কুমারডিহি) পাণ্ডবেশ্বর: টানা ১২ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস লড়াই। জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সেই লড়াই ছিল একেবারে অসম। অবশেষে ভোররাতে মিলল সাফল্য। পাণ্ডবেশ্বরে খনিগর্ভে দু’টি ডুলিতে আটকে পড়া ১২ জন শ্রমিককে জীবিত উদ্ধারে সমর্থ হল প্রশাসন ও ইসিএল। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক বিবৃতি প্রকাশ করে খনি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আটকে শ্রমিকদের সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। উদ্ধারকার্য তদারকিতে ছিলেন স্বয়ং চেয়ারম্যান, ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডঃ সতীশ ঝা। সোমবার সন্ধ্যায় যান্ত্রিক ত্রুটির জেরে সুড়ঙ্গের মধ্যেই আটকে পড়ে দুটি ডুলি। স্থানীয় বিধায়ক থেকে পুলিশ কমিশনার মহকুমা শাসক থেকে বিরোধী দলের নেতারা একযোগে ঘটনাস্থলে থেকে উদ্ধারকার্যে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন। তবে, উদ্ধারকার্য সফল হলেও কয়লা খনির লাইফ লাইন ডুলি ওঠানামার ব্যবস্থার ভয়ানক ত্রুটি নিয়ে আতঙ্কিত খনি শ্রমিকরা। বিষয়টি ধামাচাপা দিতেও তৎপর হয়েছে একাংশ। গোটা ঘটনায় ইসিএল মুখ না খোলায় সন্দেহ আরও জোরাল হচ্ছে।
পাণ্ডবেশ্বর থানার কুমারডিহি ‘এ’ কোলিয়ারিতে ঘটে এই বিপত্তি। ইসিএলের বাংকোলা এরিয়ার অধীনে রয়েছে এই কোলিয়ারিটি। অন্যান্য দিনের মতো ৪ নম্বর চাণক অর্থাৎ খুনি মুখ থেকে একটি ডুলিতে করে আটজন শ্রমিক কোলিয়ারির গভীরে কাজ করতে নামছিলেন। উল্টো দিক দিয়ে অপর ডুলিতে চারজন খনি শ্রমিক ভূপৃষ্ঠে উঠে আসছিলেন। উপর থেকে নামা ডুলিটি ৪৫ ফুট গভীরে যেতেই আটকে যায়। তখনই নিচ থেকে উঠে আসা ডুলিটিও ভূপৃষ্ঠ থেকে ১১৫ ফুট নিচে আটকে পড়ে। ডুলি ওঠানামা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। তখন খনিগর্ভে কর্মরত ছিলেন প্রায় ৩০ জন শ্রমিক। তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলে চলে আসেন পাণ্ডবেশ্বরের বিধায়ক জিতেন্দ্র তেওয়ারি, পুলিশ কমিশনার প্রণব কুমার, আসানসোলের মহকুমা শাসক অঙ্কিতা আগারওয়াল প্রমুখ। মঙ্গলবার ভোর সাড়ে পাঁচটা নাগাদ নিচ থেকে ওপরে উঠে আসা ডুলিটিকে কোনওরকমে খনির নিচে নামানো হয়। তিন নম্বর চাণক দিয়ে শ্রমিকদের উদ্ধার করে আনে ইসিএল। অন্যদিকে, যে ডুলিতে করে শ্রমিকরা কোলিয়ারির ভেতরে যাচ্ছিলেন, তাঁদের ভূপৃষ্ঠে ফিরিয়ে আনা হয়।
ঘুড়ির লাটাই যেভাবে সুতো ছাড়া এবং গোটানোর কাজ করে ডুলি ওঠানামা করার কাজটাও অনেকটা সে রকম। কয়লা খনির ওয়াইডিং ইঞ্জিন সেই লাটাইয়ের কাজটা করে থাকে। যাকে ড্রাম বলা হয়। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, সেই ড্রামে ত্রুটির জেরে এই বিপত্তি। কিন্তু কেন? শ্রমিকদের একাংশ জানান, দু’মাস আগে ড্রামটি সংস্কার করা হয়েছিল। কাজ দেখভালের দায়িত্বে থাকা ইসিএলের শ্রমিকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছিলেন একাধিক শ্রমিক। আর তখনই শাসকদলের ঘনিষ্ঠ শ্রমিক সংগঠনের নেতারা তাঁদের চোখ রাঙিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
তবে, বেলা গড়াতেই শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তাঁদের দাবি, ৩ নম্বর চাণকটি দু’মাস ধরে বন্ধ ছিল যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে। এখন চার নম্বর চাণকটি বিপর্যয় হওয়ায় উৎপাদন বজায় রাখতে কোলিয়ারি কর্তৃপক্ষ জোর করে তিন নম্বর চাণক দিয়ে শ্রমিকদের নামানোর চেষ্টা করছেন। সিটু অনুমোদিত কোলিয়ারি মজদুর সভার সাধারণ সম্পাদক মনোজ দত্ত বলেন, শ্রমিকস্বার্থ নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে ইসিএলকর্তৃপক্ষ। আমরা পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছি।’ বিধায়ক জিতেন্দ্র তেওয়ারি বলেন, ‘সকলের চেষ্টায় শ্রমিকদের সুস্থভাবে উদ্ধার করা গিয়েছে, এটাই বড় বিষয়।’



