


অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণগঞ্জ (কাদিপুর): বছর পনেরো আগের কথা। রাত পাহারায় দিন কাটত বাংলাদেশের গা ঘেঁষা গ্রাম কাদিপুরের বাসিন্দাদের। দু’ দেশের দুষ্কৃতীদের হানাদারি লেগেই ছিল। অন্ধকার নামলেই গ্রামে ঢুকে পড়া। সঙ্গে ধারাল অস্ত্র। গোয়ালঘরে ঢুকে গোরু নিয়ে চম্পট দিত। কাঁটাতার কেটে পাচার করে দিত বাংলাদেশে। মুখ খুললেই অস্ত্রের কোপ! চোখের সামনে প্রিয় পোষ্যকে নিয়ে পালিয়ে গেলেও কিছু করার ছিল না। অনেক সময় বাধা দিতে গিয়ে দুষ্কৃতীদের বোমা-গুলির মুখেও পড়তে হয়েছে গ্রামবাসীদের। সে এক দুঃসময়!
শনিবার বাড়ির দাওয়ার বসে সেই দুঃসময়ের স্মৃতিচারণ করছিলেন গ্রামের আদি বাসিন্দা সুকুমার বিশ্বাস। তাঁর কথায়, ‘সে এক দুঃস্বপ্নের দিন ছিল আমাদের। দল বেঁধে এরা রাতে আসত। গলায় হাঁসুয়া কিংবা দা ধরে গোয়াল থেকে গোরু বের করে নিয়ে চলে যেত। এমনও হয়েছে গোটা একটা পরিবারকে খুন করে গোরু ডাকাতি করেছে। গ্রামে তখন বিদ্যুৎ ছিল না। হ্যারিকেনের আলো কমিয়ে রাতভর জেগে থাকতাম। গোরুচোর এসেছে বুঝতে পারলেই হইচই শুরু করে দিতাম।’ কাদিপুরের পড়শি গ্রাম বিষ্ণুপুর। সেখানকার বাসিন্দা সুরজিৎ ঘোষ বলেছিলেন, ‘আমি তখন খুব ছোটো। দুষ্কৃতীরা আমাদের পরিবারের উপর আক্রমণ করেছিল। প্রায় প্রতি রাতেই গ্রামে ডাকাত পড়ত। গ্রামের লোকেরা রাত পাহারা দিতে মাচা তৈরি করেছিলেন। আসলে, কুড়ি বছর আগে সীমান্তে কাঁটাতার ছিল না। স্মার্ট ফেন্সিং ছিল না। গোরু পাচার করা সহজ ছিল। এখন বিএসএফ সীমান্তে অভিনব নিরাপত্তা ব্যবস্থা করেছে। আমরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সুরক্ষিত।’
দুষ্কৃতীদের এহেন দৌরাত্ম্য মুখ বুজেই সহ্য করতে হতো। থানায় কিংবা বিএসএফকে বললেই বিপদ! দুষ্কৃতীরা কোনওভাবে জেনে গেলে মারধর শুরু করে দিত। ‘সেসব এক দিন গিয়েছে। গোরু পাচার করতে গিয়ে ধানের জমিও নষ্ট করে দিত ওরা।’—সীমান্তে ঘাস কাটতে কাটতে অভিশপ্ত দিনের স্মৃতি খুঁড়লেন বিজয় বিশ্বাস। সঙ্গে সংযোজন,‘এখন অবশ্য ওদের উৎপাত প্রায় নেই বললেই চলে। এর পিছনে কারণ মূলত দু’টি। এক, এবিএসএফের কড়া নজরদারি। দুই, রাজ্য সরকারের ঢালাও উন্নয়ন।
কাদিপুর, বিষ্ণুপুরে রাস্তাঘাটের প্রভূত উন্নয়ন হয়েছে। গ্রামে বিদ্যুৎও এসেছে। সামাজিক সুরক্ষা প্রকেল্পর সুবিধা পাচ্ছেন গ্রামবাসীরা। ক’দিন আগেই স্বাস্থ্যসাথী কার্ডে বিধাননগরের নামি বেসরকারি হাসপাতালে গলব্লাডারের অপারেশন করিয়েছেন বাসিন্দা জটিরবক্স শেখ। তিনি বলছিলেন, ‘আমাদের গ্রামে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। আগে রাস্তা দিয়ে চলাচল করা যেত না। বিদ্যুৎ ছিল না। এখন সর্বত্র লাইট বসেছে। ভাঙাচোরা রাস্তা, অন্ধকার গ্রাম—দুষ্কৃতীদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধির সহায়ক।’ আর এই উন্নয়নের ছোঁয়ায় পাচারকারীরাও এখন মূলস্রোতে ফিরেছে। কৃষ্ণগঞ্জের সীমান্তে কাদিপুর এলাকায় চারটি বুথ। দু’টি বুথ বিজেপির দখলে। দু’টি তৃণমূলের। তৃণমূলের পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য অর্চনা বিশ্বাস বলছিলেন‘আমাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। এখন দশ-পনেরো বছর ধরে শান্তিতে রয়েছি। বিএসএফের সঙ্গে আমরা যৌথভাবে গ্রামের ছেলে মেয়েদের স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।’ • নিজস্ব চিত্র