শান্তনু বরঠাকুর: একটা সরকার কতটা স্বৈরাচারী হলে তার সাধারণ নাগরিকরা ভোটের আগে রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়, তা দেখিয়েছে অসম। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এবং তাঁর সরকারের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে আমরা একজোট হয়ে লড়াই করেছি। এই লড়াই নিজের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, সত্ত্বাকে টিকিয়ে রাখার লড়াই। সর্বোপরি বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করেছি আমরা। কারণ, আমরা বুঝেছি, এটা দরকার। যতটা আমাদের জন্য, তার থেকে অনেক বেশি আগামী প্রজন্মের প্রয়োজনে। না হলে খুব বেশিদিন আর অপেক্ষা করতে হবে না। আমাদের পরের প্রজন্মই ভুগবে। বাংলায় নির্বাচনি প্রচারে গিয়ে হিমন্ত বিশ্বশর্মা ও তাঁর দল ‘অসম মডেলে’র কথা বলেন। জানেন বাস্তবে অসম মডেল কী? এই মডেল ‘বিভাজনের’। নিজেদের সংস্কার-সম্প্রীতিকে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর জন্য এই মডেল। স্বয়ং হিমন্ত বিশ্বশর্মা এবং তাঁর দলের নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বহু অভিযোগ আগেও উঠেছে। এখন শুধু সেই অভিযোগের তালিকা বড়ো হচ্ছে। এই যদি ‘মডেল’ হয়, তবে মন থেকে চাইব, ভারতের আর কোনো রাজ্য যেন এমন সৌভাগ্যের ভাগীদার না হয়। না হলে অভাগা অসমবাসীর মতো এদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হবে।
এই বিজেপি সরকারকে দেশ থেকে উৎখাত করতে এইমুহূর্তে শক্ত বিরোধী প্রয়োজন। ঠিক যেমন বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আমি ব্যক্তিগতভাবে চাই, বাংলায় নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরই জয় হোক। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিজেপিকে হারাতেই হবে। আর সেটা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষই পারবেন। সে বিধানসভা নির্বাচন হোক বা লোকসভা। এমনকি পঞ্চায়েত নির্বাচন স্তরেও বিজেপিকে হারানো উচিত। বিজেপি নিজেদের ক্ষমতার জন্য যে কোনো কিছু করতে পারে। ইডি, নির্বাচন কমিশন, সিবিআই—সবকিছুকে নামিয়ে ক্ষমতা দখলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে তারা। এটাই প্যাটার্ন। অসম, বাংলা সব জায়গাতেই করছে। নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে তাঁর দলের চুনোপুঁটি নেতা-মন্ত্রীরা পর্যন্ত প্রতি মুহূর্তে ভোটের ‘মুডে’ থাকেন। দেশের উন্নয়ন চুলোয় যাক। যেখানে নির্বাচন, সেখানেই প্রাণপণে দৌড়াচ্ছেন তাঁরা। এই দৌড় ক্ষমতা দখলের। এই দৌড় নিজেদের আখের গোছানোর। অসম ভোটের আগেও এই ‘ভোটপাখি’রা এসেছেন। বারবার। লাগাতার। ১৪০ কোটি দেশবাসীর সমস্যা দেখার সময় এঁদের কখনোই থাকে না। শুধু ঝাঁ চকচকে পোশাক গায়ে জড়িয়ে একের পর এক উদ্বোধন করতে হবে। ফিতে কাটতে হবে অবিরাম। দরজির দোকানের কাঁচির ধারও তখন হার মেনে যায়। তাঁদের দেখাতেই হবে ‘উন্নয়নের ঝলক’। যদিও ফিতে কাটার পর সেই উন্নয়নের খবর রাখার দায়ভার তাঁদের নেই। সেসব গোল্লায় যাক। ছবি হয়েছে। রিলস হয়েছে। ব্যাস। এটুকুই তো চায় এরা! ঘটা করে গুয়াহাটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনালের উদ্বোধনের করার পর মরশুমের প্রথম বৃষ্টিতেই ‘উন্নয়নের ছবি’ উঠে এসেছে। ‘নিন্দুকেরা’ যদিও সেই ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ায় দেখা গেল, ছাদ বেয়ে জল পড়ছে। তাতে কী? জনগণের করের টাকায় গড়ে ওঠা টার্মিনালের এই দশা জনগণকেই ভোগ করতে হবে। মোদিজির এইসব টার্মিনাল না হলেও চলবে। তিনি ভোটের আগে নব্যনির্মিত হাইওয়েতে বিমান নামিয়ে দেখিয়েছেন, ‘আচ্ছে দিনে’ সবই সম্ভব। তাই অসমের নিরীহ হাজার হাজার মানুষকে ‘স্পেশাল এভিকশন’- এর নামে বাড়িঘর থেকে বের করে দেওয়াও সম্ভব হয়েছে। এমনকি ডিমাহাসাও, কার্বি আংলং, বড়োল্যান্ড- এর ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত জনগণরাও এর থেকে রক্ষা পায়নি। এই উচ্ছেদ অভিযানের একটাই লক্ষ্য। জনজাতি, সাধারণ মানুষকে ‘বেআইনি’, ‘জবরদখলকারী’ তকমা দিয়ে জমি ছিনিয়ে নাও। না হলে নিজেদের
কাছের বড়ো বড়ো কর্পোরেটরা মাননীয় নরেন্দ্র মোদি এবং হিমন্ত বিশ্বশর্মাদের উপর আশীর্বাদের হাত রাখবেন কী করে? আর সাধারণ মানুষের রক্ত জল করা পয়সায় তৈরি বাড়িঘর ভাঙলে নেতাবাবুদের কিচ্ছু আসে যায় না। এদের দেশে-বিদেশে প্রচুর বাড়িঘর থাকে। এই উচ্ছেদ
অভিযানে বহু পড়ুয়ার বই-খাতা বুলডোজারের আঘাতে মাটিতে মিশে গিয়েছে। এরাই পেট চালাতে কাজের খোঁজে রাজ্যের বাইরে যাবে। কোটিপতি ঠিকাদাররা ট্রাক ভরতি করে এদের বাইরের রাজ্যে নিয়ে মজুরি খাটাবেন। আর মাঝপথে বা কাজের সময় তাদের বিপদ হলে হিমন্তবাবু বলবেন, ‘এরা অসমিয়া নন, নাম দেখলেই বোঝা যায় সব বাংলাদেশি।’ অসমে ডবল ইঞ্জিনের নাকি শিক্ষাবিপ্লব চলছে, রাজ্যজুড়ে বহু সরকারি স্কুল বন্ধ। তালিকা দীর্ঘতর হচ্ছে। সরকার বুঝে গিয়েছে, এইসব সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করে ডবল ইঞ্জিন রাজ্যের মানুষ পিছিয়ে পড়বে। তাই তাদের বেসরকারি স্কুলে পড়তে হবে। আর সেই বেসরকারি স্কুলও যেন ভালো পরিষেবা দিতে পারে। তাই সেগুলিও হবে সরকার ঘনিষ্ঠ। অসম সরকারের মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন নেতা-মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ বহুদিন ধরেই সামনে আসছে। হিমন্ত বিশ্বশর্মার পরিবার নিয়ে অভিযোগ রাজ্যের সীমা ছাড়িয়ে জাতীয় স্তরেও এখন চর্চিত। যা রটে, তা কিছু হলেও ঘটে। সেই সবই জানে অসমবাসী। পদ্মের ছোঁয়া থাকলেই নেতাদের অর্থভাণ্ডার ফুলেফেঁপে ওঠে। তখন ইডি গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন থাকে। আর সরকারের বিরুদ্ধে সুর চড়ালেই ইডি-বাবুরা আদেশ পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ভোট এলে অবশ্য তাদের এই কর্মব্যস্ততা আরও বাড়ে।
দেশে বেকারত্ব বাড়ছে। রাষ্ট্রের অর্থভাণ্ডারে টান পড়ছে। আর মোদিজি এবং তাঁর সরকার ব্যস্ত নিজেদের প্রচারে। এই গেরুয়া সরকার এতই কাজ করে, যা সাধারণ মানুষের চোখেই পড়ে না! তাই সরকারকে বাধ্য হয়ে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বড়ো বড়ো পোস্টার লাগিয়ে প্রচার করতে হচ্ছে! এই যেমন ঝাড়গ্রামে ঝালমুড়ি খেয়ে, ক্যামেরা হাতে গঙ্গায় নেমে মাননীয়কে বোঝাতে হচ্ছে তিনি কতটা ‘বাংলা দরদি’। কিন্তু বাংলা সেরকমই ভাবছে তো? চার তারিখের আগে এটাই লাখ টাকার প্রশ্ন।লেখক সিনিয়র অ্যাডভোকেট, অসম