নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: সরকার তো বদলাল, কিন্তু এবার দেউচা-পাচামির ভবিষ্যৎ কী? বীরভূমের এই মেগা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত জেলা প্রশাসনের এক পদস্থ কর্তাকেই করা হয়েছিল এই প্রশ্ন। ভ্রু কুঁচকে তিনি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন-‘ওখানে কি আদৌ কয়লা আছে? লক্ষ্য ছিল তো পাথর!’ নবান্নে ক্ষমতার পালাবদল ঘটতেই দেউচা-পাচামি প্রকল্পের তথাকথিত ‘কয়লা’ নিয়ে আধিকারিকরা যেভাবে সাহস করে মুখ খুলছেন, তাতে তৃণমূল জমানার সেই বহুচর্চিত স্বপ্নের আড়ালে কী খেলা ছিল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ‘গেম চেঞ্জার’ বলে যে প্রকল্পের ঢোল পেটানো হয়েছিল, সরকার বদলে যেতেই সেই বেলুন থেকে হাওয়া বেরতে শুরু করেছে।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছিলেন, এই প্রকল্প হলে একশো বছর রাজ্যের বিদ্যুতের অভাব হবে না। লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থান হবে। প্রকল্পের ‘মুখ’ সেই চাঁদা মৌজায় গিয়ে দেখা গেল, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ছবি দেওয়া ঢাউস ঢাউস হোর্ডিং বহাল তবিয়তে থাকলেও এলাকাটি যেন এক শ্মশানপুরী। প্রশাসনের যে কর্তারা এতদিন প্রকল্পের হয়ে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে গলা ফাটিয়েছেন আজ তাঁদের গলাতেও সুর বদলেছে। সেই কর্তারাই এখন আড়ালে হাসছেন আর বলছেন, কয়লা নয়, ‘পাহাড়ের সোনা’ অর্থাৎ লাভজনক ব্যাসল্ট পাথর লুটের নেশাতেই দেউচার নীল নকশা তৈরি হয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, আমরা শুরু থেকেই এই প্রকল্পের বিরোধিতা করে এসেছিলাম। সরকার জোর করে আমাদের ভয় দেখিয়েছে, লোভ দেখিয়েছে।
প্রশাসনিক তথ্য বলছে, মোট জমির পরিমাণ প্রায় ৩৪০০ একরের বেশি। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ১৬টি গ্রামজুড়ে ৩০১০টি পরিবারকে উচ্ছেদের কথা ছিল। যারমধ্যে ১০৮৩টি পরিবারই আদিবাসী। সরকার ইতিমধ্যেই ৪০০ একর জমি কিনেছে। জমিদাতাদের পরিবারকে প্রায় ২২০০টি চাকরিও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এই চাকরি কি নিয়ম মেনে হয়েছে? খোদ প্রশাসনের কর্তাই আমতা-আমতা করে বলছেন, ‘সব কি আর নিয়ম মেনে হয়!’ দুর্নীতি কতটা গভীরে, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন আদিবাসী নেতা সুনীল মুর্মু। তাঁর বিস্ফোরক দাবি, সরকারি খাসজমি বেআইনিভাবে পাট্টা দিয়ে এক পঞ্চায়েত প্রধানের স্বামী থেকে শুরু করে খোদ প্রশাসনিক কর্তার আত্মীয়দেরও চাকরি করে দেওয়া হয়েছে। আমরা গোটা প্রক্রিয়ার তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।
অবশ্য, তৎকালীন বিরোধীরা প্রথম থেকেই এই প্রকল্পকে স্রেফ ‘ধাপ্পাবাজি’ বলে আসছিল। এনিয়ে বহু প্রতিবাদ, আন্দোলন হয়েছে। বিনিময়ে জুটেছে পুলিশের লাঠি, মার আর মিথ্যা মামলা। তৃণমূলের পতন হতেই আধিকারিকরা স্বীকার করছেন, মাটির স্তর সরিয়ে ব্যাসল্ট পাথর তোলার বরাত পেয়েছিল যে সংস্থা, তার অন্যতম কর্তা এখন বালি পাচার কাণ্ডে ইডির শ্রীঘরে। এক মাসের বেশি কাজ থমকে রয়েছে। বিজেপির জেলা সহ-সভাপতি দীপক দাসের সরাসরি অভিযোগ, কোনো বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ছাড়াই স্রেফ কাটমানির লোভে পাহাড় খোঁড়া শুরু হয়েছিল। সিপিএমের জেলা সম্পাদক গৌতম ঘোষের তোপ, এটি যে একটি প্রতারণা আর মিথ্যাচারের নামান্তর তা আমরাই প্রথম দিন থেকে বলে আসছি। যদিও এনিয়ে মুখ খুলতে চাইছেন না প্রথমসারির তৃণমূল নেতারা।
এখন প্রশ্ন একটাই, যাদের জমি নেওয়া হয়েছে সেই পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ কী? জমি এখন সরকারের কবজায় থাকলেও প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে নবান্ন থেকে এখনও কোনও সুনির্দিষ্ট নির্দেশ আসেনি। দেউচার মাটি খুঁড়লে কয়লা মিলবে নাকি স্রেফ দুর্নীতির কঙ্কাল বেরিয়ে আসবে, সেই উত্তর জানতে এখন মুখিয়ে রয়েছেন এলাকার বাসিন্দারা।