Bartaman Logo
১৭ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

ক্লাসে ঢুকে বলতেন চাঁদ উঠেছে ওই, সেই এবি স্যর আজ তারার দেশে! প্রাক্তনীদের হা-হুতাশ

ওই যে আসছেন এবি স্যর...। রামপুরহাট কলেজ ক্যাম্পাসে পিনড্রপ সাইলেন্স। আসছেন সাইকেলে চেপে। পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি, পাজামা। পরিপাটি করে ইস্ত্রি করা।

ক্লাসে ঢুকে বলতেন চাঁদ উঠেছে ওই, সেই এবি স্যর আজ তারার দেশে! প্রাক্তনীদের হা-হুতাশ
  • ১৭ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: ওই যে আসছেন এবি স্যর...। রামপুরহাট কলেজ ক্যাম্পাসে পিনড্রপ সাইলেন্স। আসছেন সাইকেলে চেপে। পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি, পাজামা। পরিপাটি করে ইস্ত্রি করা। মুখে সামান্য হাসি। তবে, গুরুগম্ভীর একটা ভাব। কলেজ গেট পেরিয়ে এবি স্যরের সাইকেল ঢুকে পড়েছে মেইন ক্যাম্পাসে। এসএফআই হোক কিংবা ছাত্র পরিষদ বা টিএমসিপি—সব সংগঠনের ছাত্র নেতাদের হম্বিতম্বি শেষ। গেটের পাশেই ক্যান্টিন। সেখানে চিল-চিৎকার। হাঁকডাক, কর্কশ স্বরে গান। টেবিল চাপড়ানো। এবি স্যরকে দেখে স্তব্ধ সবকিছু। গুটিগুটি পায়ে সবাই ক্লাসমুখো। প্রকাশ্যে কানমলা খেতে কারই বা ভালো লাগে! 

Advertisement

ক্লাসে ঢুকলেন এবি স্যর। পাতা পড়লেও শব্দ কানে আসে। জলদগম্ভীর গলায় পড়াতে শুরু করলেন—‘বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই...।’ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে পড়ুয়ারা। একে অপরের মধ্যে খুনসুঁটি নেই। ফিসফিসানি বন্ধ। ৪৫ মিনিট কখন যে কাবার হয়ে যেত, টের পেত না কেউই। শেষ হয়েও যেন শেষ হতে চাইত না এবি স্যরের ক্লাস। পড়ুয়াদের পাঠদান শেষে সাইকেল চালিয়ে রওনা দিতেন বাড়ির দিকে। কলেজ থেকে বাড়ি—মাত্র কয়েক মিনিটের পথ। কিন্তু, এবি স্যরের সময় লাগত কয়েক ঘণ্টা। স্থানে স্থানে নেমে পড়তেন সাইকেল থেকে। হাসিমুখে খবর নিতেন সবার। খবর নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো বাছবিচার ছিল না। সিপিএম, কংগ্রেস, তৃণমূল সবাই সমান। 
সেই এবি স্যর মানে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় স্যর আর নেই! ভাবতেই কুঁকড়ে উঠছেন রামপুরহাট কলেজে প্রাক্তনীরা। অন্তত, যাঁরা তাঁর স্নেহ-ভালোবাসার আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে বাংলা সাহিত্যে আজও যাঁরা স্পর্ধা দেখিয়ে চলেছেন। মানুষের মতো মানুষ হয়েছেন। তেমনই একজন কালীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। রবিবার তিনি বলছিলেন, ‘স্যর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ঠিকই। কিন্তু কলেজে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে কখনও বিভেদ করতেন না। ওঁর সবাই ছিল সমান। ক্লাস না করে কাউকে ঘুরে বেড়াতে দেখলে কান ধরে নিয়ে যেতেন। সে যত বড়ই ছাত্রনেতা হোক না কেন! তাদের শুধু একটা কথাই বলতেন, ভালো করে পড়াশোনা না করলে রাজনীতি করবে কীভাবে?’ আর এক প্রাক্তনী বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়ের কথায়, ‘সিপিএম আমলে স্যর বিধায়ক হয়েছিলেন। তখনও দেখেছি কলেজে শাসন করতে। তিনি কখনই চাইতেন না কোনো পড়ুয়া ভবিষ্যৎ জলাঞ্জলি দিয়ে রাজনীতি করুক।’ 
বনেদি বাড়ির সন্তান ছিলেন বাংলার স্যর আশিসবাবু। তাঁর হাটতলার বাড়িটার অন্দরে ও বাইরে বনেদিয়ানার ছাপ। প্রতি রবিবার সেই বাড়িতে পড়াতেন তিনি। সেখানে সব ছাত্রছাত্রীর ছিল অবারিত দ্বার। কারও কাছ থেকে তেমন কানাকড়িও নিতেন না। উল্টে আয়োজন করতেন মিষ্টি উৎসবের। বিজয়া দশমীতে সেই উৎসবের চেহারা হয়ে উঠত অন্যরকম। এবি স্যর স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর ছাত্রদের স্বপ্ন দেখাতেন ভালোবাসতেন। বলতেন, বড়লোক নয়, বড় মানুষ হয়ে ওঠো। 
কীভাবে বড় মাপের মানুষ হতে হয়, সেটাও নিজেকে ছাঁচে ফেলে ছাত্রছাত্রীদের দেখিয়ে গিয়েছেন আশিস স্যর। বিধায়ক থেকে মন্ত্রী হয়েছেন। সেই পুরনো সাইকেলটাই থেকে গিয়েছে তাঁর সঙ্গী। কলেজ থেকে অবসর নেওয়ার পর অতীত ভোলেননি। প্রাক্তনীদের সঙ্গে দেখা হলেই জানতে চাইতেন কি রে, কেমন আছিস? এদিন সেই এবি স্যরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে গলা ধরে আসছিল কংগ্রেস নেতা তথা রামপুরহাট কলেজের প্রাক্তন জিএস মিল্টন রশিদের। বলছিলেন, ‘সামনাসামনি দেখা হলে এগিয়ে এসে বলতেন, ভালো আছিস তো।’ বিজেপি নেতা শুভাশীষ চৌধুরীর কথায়, ‘এমনটা প্রত্যাশিত ছিল না। রাজনীতির অন্য জগতের মানুষ ছিলেন স্যর।’
এবি স্যরের আজ সবই অতীত! আর কলেজে আসবেন না তিনি।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ