নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: চিৎকার-চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল তাঁদের। পাশের ঘরে তখন আগুন জ্বলছে দাউদাউ করে। ধোঁয়ায় ভরে গিয়েছে চারপাশ। এমন অবস্থায় পালানো ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। কিন্তু সেই রাস্তাও বন্ধ! প্রাণভয়ে ছাদের দিকে ছুটলেন তাঁরা। ছাদে যাওয়ার দরজা বন্ধ। নীচে নেমে যাওয়ার সিঁড়ি কালো ধোঁয়ায় এতটাই ঢেকে রয়েছে যে সেদিক দিয়ে বাইরে যাওয়া অসম্ভব। ধীরে ধীরে দমবন্ধ হয়ে আসে দুই বাসিন্দারা। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁরা লুটিয়ে পড়লেন। ররিবার রাতে ৬৫ এ, পাথুরিয়াঘাটা স্ট্রিটের একটি কাপড়ের গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মারা গিয়েছেন দু’জন। দমকলের ১৫টি ইঞ্জিনের চেষ্টায় সোমবার সকালে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। ছাদে যাওয়ার সিঁড়িতে পড়ে থাকা দু’টি নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তাঁদের মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। পুলিস জানিয়েছে, মৃতদের নাম সুনীলকুমার শর্মা(৪৮) ও কিষাণলাল উপাধ্যায় (৫৮)। দু’জনেই রাজস্থানের বাসিন্দা। পেশায় পুরোহিত। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, বদ্ধ ঘরে অগ্নিকাণ্ডের ফলে দমবন্ধ হয়েই তাঁরা মারা গিয়েছেন।
রবিবার রাত ১টা নাগাদ আগুন লাগে পাথুরিয়াঘাটা স্ট্রিটের একটি ধর্মশালা কাম কমার্শিয়াল বিল্ডিংয়ের চারতলার কাপড়ের গুদামে। সেই সময় ওই বিল্ডিংয়ের ভিতরে যাঁরা ছিলেন, আটকে পড়েন। সঙ্কীর্ণ গলির পাশে ঘটনাস্থল হওয়ায় দমকলের গাড়ি ঢুকতেও কিছু সমস্যা হয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয় দমকলকর্মীদের। ততক্ষণে আগুন চতুর্থ তলের সবক’টি ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাণভয়ে এদিক-ওদিক ছুটছেন বাসিন্দারা। দু’জন বাসিন্দাকে রাতেই উদ্ধার করেন পুলিস ও দমকলকর্মীরা। মুন্না রাম ও রজনী রাম নামে সেই দুই যুবককে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁদের ছেড়েও দেওয়া হয়। কিন্তু রাজস্থানের দুই মাঝবয়সি ব্যাক্তিকে আর বাঁচানো যায়নি। রাতেই ঘটনাস্থলে যান কলকাতার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার ইলোরা সাহা। সোমবার সকালে সেখানে যান মেয়র ফিরহাদ হাকিম।
প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, যে কাপড়ের গুদামে আগুন লেগেছিল, কিষাণলাল ও সুনীলকুমার তার পাশের ঘরেই ঘুমিয়েছিলেন। ছাদের দরজায় তালা দেওয়া থাকায় তাঁরা বের হতে পারেননি। আগুনের তাপ ও ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন তাঁরা। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এই দু’জনের বন্ধুত্বের সম্পর্ক। সুনীলের ভাইপো ভিকেশ শর্মা জানিয়েছেন, বড়বাজারের অন্য জায়গায় তাঁর কাকার ঘর ছিল। এখন তিনি পাথুরিয়াঘাটা স্ট্রিটের ওই বিল্ডিংয়ে থাকতেন। রাজস্থান থেকে কলকাতায় ঘুরতে এসেছিলেন কিষাণ। গরমের মধ্যে এসি ঘরে ঘুমোবেন বলে সুনীলের কাছে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু ভাবতে পারেননি যে এই ঘুমই তাঁদের ‘শেষ ঘুম’ হতে চলেছে। কীভাবে আগুন লাগল, তা স্পষ্ট নয়। শর্ট সার্কিট থেকেই আগুন লেগে থাকতে পারে বলে প্রাথমিক অনুমান দমকলের। তবে গোটা ভবনটি একটি আবাসন থেকে কমার্শিয়াল বিল্ডিংয়ে রূপান্তরিত করা হয়েছিল। সেক্ষেত্রে যে ধরনের অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা থাকার কথা ছিল, তা ছিল না বলে অভিযোগ। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে জোড়াবাগান থানা।