লিডস: পেন্ডুলামের মতো দুলছে ম্যাচ। কখনও এপাশে, কখনও ওপাশে। নাটকীয় ঘাত-প্রতিঘাতে ভরা সিরিজের প্রথম টেস্টে আপাতত কাউকেই এগিয়ে রাখা যাচ্ছে না। জেতার জন্য চতুর্থ ইনিংসে ইংল্যান্ডের দরকার ৩৭০। একসময় যদিও টার্গেটটা চারশো পেরিয়ে যাবে বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু লোকেশ রাহুল ও ঋষভ পন্থ আউট হতেই আরও একবার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে ইনিংস। লোয়ার মিডল অর্ডারের ব্যর্থতায় ৩৬৪ রানে থেমে যায় দৌড়। ভারতের শেষ ছ’টি উইকেট পড়ল মাত্র ৩১ রানে! জবাবে চতুর্থ দিনের শেষে ইংল্যান্ডের রান বিনা উইকেটে ২১। অর্থাৎ শেষ দিনে জয়ের জন্য তাদের প্রয়োজন ৩৫০ রান। আর ভারতকে তুলতে হবে ১০ উইকেট।
অথচ, দিনের শুরুতে শুভমান ফিরে যাওয়ার পরও ভারতকে মজবুত অবস্থানে দেখাচ্ছিল রাহুল ও পন্থের জুটির দৌলতে। উভয়েই করলেন সেঞ্চুরি। এই টেস্টে টিম ইন্ডিয়ার শতরানের সংখ্যা দাঁড়াল পাঁচ। প্রথম ইনিংসে যশস্বী জয়সওয়াল, শুভমান গিল ও ঋষভ পন্থ। দ্বিতীয় ইনিংসে লোকেশ রাহুলের সঙ্গে ফের পন্থই। ভারতের টেস্ট ইতিহাসে যা নজিরবিহীন। সোমবার সকালের প্রতিকূল কন্ডিশন কাটিয়ে চতুর্থ উইকেটে রাহুল ও পন্থের ১৯৫ রানের জুটিই চালকের আসনে বসায় দলকে। তখনই জয়ের গন্ধ পেতে থাকে শিবির। কিন্তু করুণ নায়ার, রবীন্দ্র জাদেজা, শার্দূল ঠাকুররা সুযোগের সদ্ব্যবহারে ব্যর্থ।
এদিন সকালে খেলা শুরুর সময় ভারতের লিড ছিল ৯৬। ক্যাপ্টেন শুভমান গিল দ্রুত ফেরেন। তিনি বোল্ড হতেই রক্তের গন্ধ পাওয়া বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ইংল্যান্ড। এই সময়ই ধৈর্যের পরীক্ষা দেন পন্থ-রাহুল। সকালের সেশনে ওঠে মাত্র ৬৩। দ্বিতীয় সেশনে খোলস ছেড়ে বের হন পন্থ। স্ট্রোকের ফুলঝুরিতে ইংল্যান্ডের বোলারদের ক্লাবস্তরে নামিয়ে আনেন তিনি। এই সেশনে ২৭ ওভারে ওঠে ১৪৫!
টেস্টে নবম সেঞ্চুরি পূর্ণ করার পথে দলকে ভরসা জোগান রাহুলও। এর মধ্যে আটটিই বিদেশে। এশিয়ার বাইরে ওপেনার হিসেবে ছয়টি শতরান হয়ে গেল তাঁর। এই তালিকায় ভারতীয়দের মধ্যে সামনে শুধুই সুনীল গাভাসকর (১৫)। তবে তিন অঙ্কের রানে পৌঁছে তেমন উচ্ছ্বাস দেখাননি রাহুল। পন্থও শান্তই থাকলেন। এমনকী, গাভাসকরের সামারসল্ট দেওয়ার ইশারাও এড়িয়ে গেলেন তিনি। তবে ইংল্যান্ডের মাটিতে প্রথম ভারতীয় হিসেবে টেস্টের দুই ইনিংসে শতরানের বিরল কীর্তির মালিক হওয়ার মুহূর্তে পেলেন গ্যালারির অভিবাদন। আর সামগ্রিকভাবে বিলেতে মাত্র একজন কিপারেরই টেস্টের দুই ইনিংসে সেঞ্চুরি ছিল। তিনি জিম্বাবোয়ের অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার। এই তালিকায় নাম লেখালেন ২৭ বছর বয়সি। এর আগে বিদেশে টেস্টের দুই ইনিংসে শতরানের নজির ছিল চার ভারতীয়ের। পন্থ হলেন পঞ্চমজন।
১৪০ বলের ইনিংসে ভারতের সহ-অধিনায়ক মারেন ১৫টি বাউন্ডারি ও তিনটি ছক্কা। ৮৩ বলে পঞ্চাশ পূর্ণ করার পর ঝড় তোলেন পন্থ। পরের ২৫ বলে আসে ৪৪। তবে ৯৫ থেকে শতরানে পৌঁছতে চরিত্রবিরোধী মেজাজে নেন ২২ বল। তারপরই অবশ্য জো রুটের ওভারে একটা ছক্কা ছাড়াও মারেন দুটো বাউন্ডারি। আউটও হন ছক্কা হাঁকানোর নেশাতেই। পন্থের টি-২০ ঢঙের ঝুঁকিপূর্ণ ইনিংসের একেবারে উল্টো মেরুতে ছিলেন রাহুল। পঞ্চাশ আসে ৮৭ বলে। শতরানে পৌঁছতে নেন ২০২ বল। আসলে তখন একটা দিক আগলে রাখাই ছিল জরুরি। আর সেই ভূমিকাতে অনবদ্য দেখাল তাঁকে। সেজন্যই ইরফান পাঠান এই ইনিংসকে চিহ্নিত করেছেন ‘সঙ্কটমোচন ব্যাটিং’ হিসেবে। শেষ পর্যন্ত ১৩৭ রানে ফেরেন তিনি।
ফের হতাশ করেন করুণ নায়ার। কোনও চাপ নেই, এমন পরিস্থিতিতেও দ্রুত ফিরলেন তিনি। ঘরোয়া ক্রিকেটের থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তফাতটা এবার নিশ্চয়ই টের পাচ্ছেন তিনি।