বলরাম দত্তবণিক, রামপুরহাট: অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা ছাড়াই তীর্থক্ষেত্র তারাপীঠে অধিকাংশ হোটেল ও লজ রমরমিয়ে চলছে। ফায়ার লাইসেন্সই নেই। নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তৈরি হওয়া এসব বহুতল ও ঘিঞ্জি অলিগলি এখন কার্যত জতুগৃহে পরিণত হয়েছে। পর্যটক ও পুণ্যার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। সোমবার ভোররাতে পাঁচতলা হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুই শিশু সহ মোট ন’জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর হোটেল ও লজ মালিকদের বেপরোয়া মনোভাব ও প্রশাসনিক গাফিলতি আবারও প্রকাশ্যে আনল। আগের সরকার ও টিআরডিএর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিধায়ক ও মন্ত্রী।
তারাপীঠ মন্দির সংলগ্ন এলাকা থেকে ভিআইপি রোড, এসবিআই ব্যাংক চত্বর, মুণ্ডমালিনীতলা এবং দ্বারকা নদের ব্রিজ ও পাড় সংলগ্ন এলাকায় চারশোরও বেশি হোটেল ও লজ গড়ে উঠেছে। অভিযোগ, কোনো ছাড়পত্র ছাড়াই শুধুমাত্র পঞ্চায়েতের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে তারা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। যাতায়াতের রাস্তা এত সংকীর্ণ যে আগুন লাগলে দমকলের গাড়ি ঢোকা অসম্ভব। অথচ টিআরডিএর পক্ষ থেকে বিল্ডিং প্ল্যান পাশ করে দেওয়া হয়েছে। জলাশয় ভরাট করে অবৈধ নির্মাণ হওয়ায় প্রয়োজনে জল পাওয়ারও কোনো উপায় নেই। অভিযোগ উঠেছে, কিছু ব্যবসায়ী দালাল মারফত দমকলের ভুয়ো ছাড়পত্র জোগাড় করেও ব্যবসা চালাচ্ছেন।
গতবছর রাজ্যে একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর মহকুমা প্রশাসন ১৫দিনের মধ্যে ফায়ার লাইসেন্সের জন্য প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে বলেছিল। তা সত্ত্বেও অধিকাংশ হোটেল কোনো নথি জমা দেয়নি। দমকলের এক আধিকারিক বলেন, ৯০শতাংশ হোটেল ও লজের দমকলের ছাড়পত্র নেই।
এদিন অভিশপ্ত হোটেল পরিদর্শনে এসে রামপুরহাটের বিধায়ক ধ্রুব সাহা বলেন, এটাই টিআরডিএর দুর্নীতি। ওরা কেবল হোটেল, লজ থেকে টাকা তুলে কোনো চেকিং ছাড়াই বিল্ডিং নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে। অধিকাংশ হোটেলে ফায়ার লাইসেন্স ও কোনো নিরাপত্তা নেই। বিগত সরকারের নজরদারির অভাবে এই পুণ্যভূমি জতুগৃহে পরিণত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে বিস্তারিত জানিয়েছি। কয়েকদিন পর কৌশিকী অমাবস্যায় লক্ষ লক্ষ ভক্ত আসবেন। তার আগেই ফায়ার সহ সব ব্যবস্থা করতে হবে। এখানে স্থায়ী দমকল কেন্দ্র নেই। তিন-চার মাসের মধ্যে এখানে স্থায়ী দমকল কেন্দ্র হবে।
এদিন বিকেলে দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী অভিশপ্ত হোটেল পরিদর্শনের পর বলেন, ১৫ বছর কী রাজত্ব চলেছে বুঝতেই পারছেন। এখানে গায়ে গায়ে প্রায় ৪০০টি হোটেল ও লজ আছে। চারদিকে জায়গা ছাড়া নেই। বহুতল নির্মাণের বিধি মানা হয়নি। এগুলি কীভাবে বিল্ডিং নির্মাণের অনুমতি ও ফায়ারের ছাড়পত্র পেয়েছে? ভয়ঙ্কর জটিল অবস্থায় আছে। এই হোটেলের পুর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে। পাশাপাশি তিনি বলেন, আমাদের ভাবনা আছে গোটা রাজ্যজুড়েই ফায়ার সেফটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার। যাতে এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা না ঘটে।
এদিন তারাপীঠের হোটেল মালিকদের নিয়ে রামপুরহাটে বৈঠকও করেন মন্ত্রী। জেলাশাসক ও জেলার পুলিশ সুপারও ছিলেন। মন্ত্রী জানান, সমস্ত হোটেল ও লজকে ফায়ার লাইসেন্স নিতে হবে। এখানে ফায়ার অডিট হবে। বেনিয়ম হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। টিআরডিএর প্রাক্তন ভাইস চেয়ারম্যান সুকুমার মুখোপাধ্যায় বলেন, ২০২৪সাল থেকে প্ল্যানের দায়িত্ব পেয়েছে টিআরডিএ। এই হোটেলটি তার অনেক আগে তৈরি হয়েছে। সরকারি আধিকারিকরা প্ল্যান পাশ করেন। আমরা টেকনিক্যাল পার্সন নই।