সুদীপ্ত রায়চৌধুরী , কলকাতা: তৃতীয়াতেই শহরের মণ্ডপে মণ্ডপে উপচে পড়া ভিড়। দমদম পার্কে তিল ধারণের জায়গা নেই। বিকেলে কয়েকটি পুজো দেখে ঘাম মুছতে মুছতে ভারতচক্রের প্যান্ডেলে ঢুকছেন এক দম্পতি। চোখেমুখে ক্লান্তি। তবু ঠাকুর তো দেখতেই হবে। তাঁরা চলমান আলোর পথ ধরে মণ্ডপে ঢুকলেন। তাঁদের দু’পাশে ফুটে উঠছে থ্রিডি হলোগ্রামের মাধ্যমে তৈরি করা ইমেজ। দেখেই মুগ্ধ তাঁরা। ক্লান্তির ছাপ উধাও। পৌঁছলেন মণ্ডপের মধ্যভাগে, দুর্গামূর্তির সামনে। উঁচু একটি আসনের উপর ধ্যানরতা দুর্গা। তাঁর চার সন্তান নিচে বসে। তাঁরাও ধ্যানমগ্ন। চারপাশ ঘিরে সাদা ধোঁয়ার বলয় অস্বচ্ছ করে তুলছে আবহ। অনুচ্চস্বরে যন্ত্রসঙ্গীত সঙ্গত করছে সেই পরিবেশের। মন্দ্রিত সুর আর দুর্গার চারপাশ ঘিরে থাকা শক্তির বলয়ের তরঙ্গ দর্শকদের শরীর-মনজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। শান্ত করছে মন। মাতৃ দর্শনের পর যখন মণ্ডপ থেকে বেরলেন ওই দম্পতি, তাঁদের চোখেমুখে তৃপ্তি। মন প্রশান্ত।
পুজোর তীব্র ভিড়ে পা যখন ক্লান্ত, মন যখন অশান্ত, তখন ভারতচক্র ছড়িয়ে দিচ্ছে শান্তির বার্তা। ২৫তম বর্ষে তাদের থিম, ‘তন্মাত্র’ (দ্য অরা)। শিল্পী সুশান্ত শিবাণী পালের কথায়, ‘অরা’ বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদের একটু ফিরে যেতে হবে ফিজিক্সের দুনিয়ায়। পৃথিবী বা ব্রহ্মাণ্ডের যে কোনও বস্তু, তা সে সজীব হোক বা নির্জীব, সবই আসলে এনার্জি বা শক্তির একটি রূপ। কিন্তু সেই বস্তুর একটা ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। ফলে বাড়তি শক্তি ওই বস্তুটিকে ঘিরে থাকে। সেটাই ওই বস্তুটির ‘অরা’। এখানে অবশ্য গোটা বিষয়বস্তুর মূল কেন্দ্রে রয়েছেন মা দুর্গা। এখানে দেবী প্রতিমাকে প্রদক্ষিণ করছে একটা শক্তির বলয়। কিন্তু খালি চোখে সেই শক্তিকে দেখা যায় না। কিন্তু এখানে সেই শক্তিকেই একটি অবয়ব দেওয়া হয়েছে। দশর্করা যখনই দেবীমূর্তির কাছে পৌঁছবেন, তাঁরা দুর্গাকে পরিবেষ্টিত করে থাকা শক্তিকে উপলব্ধি করবেন। শুধু মাতৃমূর্তি নয়, মণ্ডপের বিভিন্ন জায়গায় নিউরন, মস্তিষ্কের কোষের মতো পার্টিকল তৈরি করা হয়েছে থ্রি ডি হলোগ্রামের মাধ্যমে। সেগুলিকেও ঘিরে রয়েছে শক্তির বলয়।’ পুজোর যুগ্ম সম্পাদক সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘দেবীর চারপাশে তাঁর ‘তন্মাত্র’ সদা বিরাজমান। কিন্তু তা খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়। কেবলমাত্র গভীর অনুভূতির মধ্যে দিয়ে সেই শক্তির অস্তিত্বকে উপলব্ধি করা যায়। আমাদের কাছে এটা একটা থিম নয়, ভক্তি, শিল্প ও আত্মিক শক্তির মিলনক্ষেত্র। মানুষ এখানে এলে শান্তি পাবেন।’
জীবনানন্দ দাশ দু’দণ্ড শান্তি খুঁজে পেয়েছিলেন নাটোরের বনলতা সেনের কাছে। প্যান্ডেল হপিংয়ের মধ্যে দর্শকরা কিছুটা শান্তির খোঁজ পাবেন ভারতচক্রের পুজো মণ্ডপে। উদ্যোক্তারা এ বিষয়ে নিশ্চিত।